সহিংস অপরাধ, কিশোর গ্যাং, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র আর ডিজিটাল জালিয়াতি এখন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অপরাধের তথ্য পর্যালোচনা করে তিন ধাপের একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এর লক্ষ্য অপরাধ কমানো, দেশে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
পুলিশ সদর দপ্তরের কয়েকটি উপকমিটির মধ্যে অপরাধ ব্যবস্থাপনা শাখার ডিআইজি মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের এই কমিটি কাজ করেছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতেই এসব উপকমিটি। বড় ধরনের অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করবে এই কমিটি।
কমিটির এক জ্যেষ্ঠ সদস্য (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমরা পুলিশের সাড়া দেওয়ার সময়ের ব্যবধান কমাতে চাই, শৃঙ্খলা ফেরাতে চাই এবং গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির ওপর ভর করে কাজ করতে চাই। থানার কাজ আলাদা না করলে আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি না চালু করলে সাইবার জালিয়াতি ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো নতুন অপরাধ মোকাবিলা কঠিন হবে।
দ্য ডেইলি স্টার ওই কমিটির প্রতিবেদনের একটি কপি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বছরে গড়ে ৩ হাজার ৩১৮টি হত্যা মামলা হয়। এসব হত্যার পেছনে অন্যতম কারণ জমি নিয়ে বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গণপিটুনি এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার।
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরে গড়ে ২০ হাজার ৪৭০টি এ ধরনের মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ৫ হাজার ৪৩৮টি। বছরে গড়ে ৪৮টি ঘটনায় ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ থাকে।
শহরাঞ্চলে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারকে ক্রমবর্ধমান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা রাস্তায় সহিংসতা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মাদক বিক্রি এবং সাইবার অপরাধেও জড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে বছরে গড়ে ৯ হাজার ১৭৮টি চুরির, ২ হাজার ৭৩৩টি ডাকাতির, ১ হাজার ৩৩৩টি ছিনতাইয়ের এবং ৪৪৫টি দস্যুতার মামলা হয়। কেবল দস্যুতা ও ডাকাতিতে বছরে গড়ে ৪৮ জনের মৃত্যু হয়।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ব্যবহার করে ১ হাজার ১০৬টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মারা গেছেন ২৭২ জন।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ১১২টি অপহরণের মামলা হয়েছে। অন্যদিকে, চাঁদাবাজি ব্যবসা ও বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।
দেশে বছরে গড়ে ৬৮ হাজার ৬৪১টি মাদকসংক্রান্ত মামলা হয়। ইয়াবা পাচারের কেন্দ্র কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম, হেরোইনের কেন্দ্র রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ময়মনসিংহ।
মানব পাচারের মামলাও বেড়েছে। ২০২২ সালে ৬৯৭টি মামলা হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ১২৬টিতে দাঁড়িয়েছে।
কমিটি বলেছে, মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রতিবছর অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন।
অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তারকেও বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেছে কমিটি। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১০ হাজার ১০৭টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। তবে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটির মতে, এসব লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা জরুরি। কারণ এগুলো হত্যা, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধে ব্যবহার হতে পারে।
২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত অনলাইন জুয়া নিয়ে পুলিশ ২৭৯টি মামলা করেছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করাও পুলিশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ২০২৫ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে ৪৩ হাজার ৮২১টি জিডি করা হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের ওই কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪৬৪টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তিন ধাপের পরিকল্পনা
প্রথম ধাপে এক বছরের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টহল জোরদার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অভিযানের সময় বডি ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া, থানায় দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা চালু এবং অনলাইনে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে টার্গেড অভিযান চালানোরও সুপারিশ করেছে কমিটি। এ জন্য অপরাধীদের বিশেষ তথ্যভাণ্ডার তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১১০ ধারা এবং বেঙ্গল পুলিশ রেগুলেশনের ৬২৮ নম্বর বিধি প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সারা দেশে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবা ও অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত করার সুপারিশ করা হয়েছে। অপরাধের ঘটনাস্থল ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ইউনিট গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে।
জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সাইবার অপরাধ ইউনিট এবং জেলা পর্যায়ে মাদক প্রতিরোধ সেল গঠনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য সংরক্ষণে স্বয়ংক্রিয় তথ্যভাণ্ডার তৈরির পাশাপাশি সাক্ষী ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ডেস্ক করার কথা বলা হয়েছে। আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে সাক্ষীদের স্বয়ংক্রিয় এসএমএসের মাধ্যমে জানানোর ব্যবস্থাও প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের সূচক বা অপরাধের চিত্র তুলে ধরার ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
তৃতীয় ধাপে দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে অপরাধপ্রবণ এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিসিটিভি নজরদারি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অপরাধ তদন্তকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনতে ‘ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম’ চালুর এবং পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পর্যাপ্ত কম্পিউটার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো থানার সদস্যদের দায়িত্ব দুটি আলাদা শাখায় ভাগ করা, অপারেশন ও তদন্ত।
এছাড়া অপরাধের ঘটনাস্থলে ব্যবহারের জন্য বিশেষায়িত যান, ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পরিবহনে ফ্রিজিং ভ্যান, আধুনিক আলামত সংরক্ষণাগার এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অবকাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারকে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে অর্থের প্রয়োজন হবে। এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে।