Image description

পেট্রোল পাম্পে গিয়ে এক লিটার জ্বালানি কিনতে এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলাদেশে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। একই সময়ে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। দাম বাড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে এক লিটার পেট্রোলের জন্য যে ১৬০ টাকা দিচ্ছেন, তার কতটা জ্বালানির দাম আর কতটাই বা সরকারের কর-শুল্ক?

পেট্রোলে কি নির্দিষ্ট টাকা কর দিতে হয়?

এখানে প্রথমেই একটি বিষয় বোঝা দরকার। বাংলাদেশে পেট্রোলের ক্ষেত্রে এমন কোনো সহজ হিসাব নেই যে, প্রতি লিটার থেকে নির্দিষ্ট ১০ বা ২০ টাকা শুধু কর হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি আমদানির পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর আরোপ করা হয় এবং সেগুলোর হিসাব পণ্যের মূল্য ও নির্ধারিত কর কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ পাম্পে ১৬০ টাকা দিয়ে এক লিটার পেট্রোল কেনার অর্থ এই নয় যে এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক সরাসরি ‘ট্যাক্স’ হিসেবে আলাদা করে কেটে রাখা হয়েছে। আমদানি মূল্য, শুল্ক, কর, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিপণনসহ বিভিন্ন ব্যয় ও মূল্য নির্ধারণের উপাদান মিলেই খুচরা দাম তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

তাহলে সরকার জ্বালানি থেকে কত রাজস্ব পায়?

জ্বালানি আমদানি সরকারের জন্য বড় রাজস্বের উৎসও। সাম্প্রতিক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, শুধু ডিজেল আমদানি থেকেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারকে ১১ হাজার ২২৮ কোটি টাকার বেশি শুল্ক ও কর দিয়েছে। অর্থাৎ জ্বালানির ওপর আরোপিত কর শুধু ভোক্তার পাম্পে দেওয়া দামের বিষয় নয়; আমদানির পর্যায়েও এর বড় আর্থিক প্রভাব রয়েছে।

 

করের হার কত?

জ্বালানি পণ্যের ধরন অনুযায়ী কর কাঠামো এক নয়। সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বাজারে আমদানি করা জ্বালানি তেলের ওপর বর্তমানে মোট শুল্ক ও করের হার প্রায় ২৫ শতাংশ থেকে ২৮.১৮ শতাংশ। তবে ফার্নেস অয়েলের ক্ষেত্রে এই করের হার সর্বোচ্চ ৩৬.৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। সম্প্রতি কর নির্ধারণের পদ্ধতি 'ট্যারিফ ভ্যালু' (স্থির মূল্য) থেকে পরিবর্তন করে 'ইনভয়েস ভ্যালু' (আমদানি চালানের প্রকৃত মূল্য) করার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিটার প্রতি করের প্রভাব সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ নতুন মূল্য সমন্বয়ের পর, প্রতি লিটার ডিজেলে শুল্ক ও কর বাবদ দিতে হচ্ছে প্রায় ৩১.৮৫ টাকা থেকে ৩৩ টাকা। একইভাবে প্রতি লিটার অকটেনে প্রায় ২২.৭৮ টাকা, পেট্রোলে ২২.০৫ টাকা এবং কেরোসিনে ২১.৭৯ টাকা কর বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা হয়।

হঠাৎ জ্বালানির দাম বাড়লো কেন?

এবারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বড় কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এবং জাহাজ পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানি আমদানির খরচে। সরকারের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে বিপিসির ওপরও বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে বিপিসির ঘাটতি ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার ঠেকানোর বিষয়টিও মূল্য সমন্বয়ের যুক্তির অংশ হিসেবে এসেছে।

২০ টাকা বাড়ার প্রভাব কোথায়?

এক লিটার পেট্রোলে ২০ টাকা দাম বাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর জন্য সরাসরি বাড়তি ব্যয়। ধরুন, কোনো ব্যক্তি মাসে ৫০ লিটার পেট্রোল ব্যবহার করেন। নতুন দামে আগের তুলনায় শুধু জ্বালানিতেই তার মাসিক খরচ বাড়বে ১ হাজার টাকা। তবে প্রভাব এখানেই শেষ নয়। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ব্যয়ও বাড়ে। ফলে উৎপাদন থেকে পরিবহন হয়ে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত খরচ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ কারণেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু গাড়ির মালিকের সমস্যা হিসেবে দেখা যায় না। অর্থনীতিবিদরা জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কার কথাও বলেছেন।

বিজ্ঞাপন
 

তাহলে ১৬০ টাকার পেট্রোলে আপনার ট্যাক্স কত?

এর সরাসরি উত্তর হলো ১৬০ টাকা থেকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক বাদ দিয়ে সেটিকেই ‘প্রতি লিটারের ট্যাক্স’ বলা ঠিক হবে না। কারণ করগুলো মূলত আমদানি পর্যায়ের মূল্য ও নির্ধারিত কাঠামোর ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। পেট্রোলের সুনির্দিষ্ট আমদানি মূল্য, করযোগ্য মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট সব ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব ছাড়া প্রতি লিটারে ঠিক কত টাকা কর রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব নয়।

তাই পাম্পে ১৬০ টাকা দিয়ে এক লিটার পেট্রোল কেনার সময় মনে রাখা দরকার এই দামের পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক তেলের দাম নয়; আমদানি ব্যয়, কর-শুল্ক, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিপণন এবং দেশের জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার একাধিক উপাদান কাজ করে। জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাবও তাই পাম্পের দামের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।

বিজ্ঞাপন

সূত্র: বাংলাদেশ কাস্টমস, রয়টার্স, প্রথম আলো