আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় ঘনিষ্ঠতা, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা এবং প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৪৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, অভিযোগ উঠা এসব ক্যাডার কর্মকর্তাদের দ্রুত বদলির সুপারিশও করা হয়েছে। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদন এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তালিকাটি পর্যালোচনার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঢাকার বাইরে বদলির উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজধানীর ঢাকা উদ্যান সরকারি কলেজে কর্মরত একাধিক শিক্ষকের নাম রয়েছে তালিকায়। তাদের মধ্যে অধ্যাপক মো. তারিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক অশ্রুময়ী সাহা, মেহের নিগার, ইশরাত জাহান, শেফালি রাণী কর্মকার, শাহীন আক্তার চৌধুরী, মুহাম্মদ ফয়সাল মিয়া ও মাজেদা খাতুনের নাম রয়েছে। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক কামরুন নাহার, মো. ফজলুল হক, হাবিবা নাজনীন এবং অধ্যাপক মাসুদা বেগমের নামও তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের কারও বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন একই কলেজে কর্মরত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে, আবার কারও বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে থাকার বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে কলেজটি চালুর পর থেকেই কয়েকজন কর্মকর্তা একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। একই সঙ্গে কোনো কোনো বিষয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষক রয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সপ্তাহে সীমিতসংখ্যক ক্লাস ও দায়িত্ব পালনের পর অন্য দিনগুলোতে কলেজে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সরকারি কলেজে দীর্ঘদিন কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তার নামও তালিকায় রয়েছে। ঢাকা কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. সোহেল সরকার, শামওনু হাসান, সামাদ খান এবং আশিক মাহমুদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. সজল আলীর নামও তালিকায় রয়েছে। তার বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং দীর্ঘদিন একই কলেজে কর্মরত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
মাউশি অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে। তাদের মধ্যে মাউশির উপপরিচালক মো. শওকত হোসেন মোল্লা, কমার্শিয়াল সেল ও আইন শাখার অফিসার্স ইনচার্জ হাবিবুর রহমান এবং প্রকিউরমেন্ট অফিসার-২ সুলতানা ইশরাত জাহানের নাম রয়েছে। এ ছাড়া পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখায় কর্মরত পরিচালক প্রফেসর মীর জাহিদা খাতুন, গবেষণা কর্মকর্তা রুকসানা কনা ও কাজী তহুরা, সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান ও কামরুন নাহার এবং গবেষণা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের নামও তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
তালিকায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন একই দপ্তর বা প্রকল্পে থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর ড. মীর জাহীদা নাজনীন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘিদিন ধরে ঢাকায় কর্মরত রয়েছি এটা সত্য। আমি বিভিন্ন প্রকেল্পে ছিলাম। আমার অভিজ্ঞতার কারণেই আমাকে রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
মাউশির উপ-পরিচালক মো. শওকত হোসেন মোল্যা বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগের সময় আমি পাঁচ বছর সন্দ্বীপে ছিলাম। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার সমিতিতে আওয়ামী লীগ সমর্থক নেতাকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলাম। এরপরও যদি আমি আওয়ামী লীগ হয়ে যাই তাহলে বলার কিছু নেই।’
‘গোয়েন্দা সংস্থা তালিকা করেছি বলে শুনেছি। তালিকায় থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।’- অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, মাউশি মহাপরিচালক
ঢাকার বাইরে কর্মরত কয়েকজনকেও বদলির সুপারিশ
গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় শুধু ঢাকায় কর্মরত কর্মকর্তারাই নন, দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও শিক্ষা প্রশাসনের দপ্তরে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা আবু সায়েম মোহাম্মদ হাসান, জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজের মো. ইমরান হোসেন, চট্টগ্রাম সিটি কলেজের মো. গোলাম মোস্তফা, মুন্সীগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের শেখ নূর কুতুবুল আলম এবং কুমিল্লা মহিলা কলেজের এমদাদুল বারীর নাম তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মাদারীপুর সরকারি কলেজের সরকার মোহাম্মদ শফিউল্লাহ দিদার, সিলেটের এমসি কলেজের শুভ রায় এবং ঢাকা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আফসানা শিরিনের নামও রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। আফসানা শিরিনের বিরুদ্ধে গত ১৯ মে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ বিভাগীয় ব্যবস্থা ও বদলির আবেদন করেছেন বলে তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এনসিটিবির কর্মকর্তারাও তালিকায়
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কয়েকজন কর্মকর্তার নামও তালিকায় রয়েছে। তাদের মধ্যে উপসচিব সিরাজুল ইসলাম, গবেষণা কর্মকর্তা মু. আবিদুর রহমান আবেদ, মাহমুদ বিন আমিন, মো. তরিকুল ইসলাম, মো. মনির হোসেন মজুমদার এবং রুমা বেগমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে থাকা এবং অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তালিকায় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, দলীয় প্যানেল থেকে নির্বাচন, সাবেক মন্ত্রীদের সুপারিশে পদায়ন, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তালিকাটি শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং তা পর্যালোচনা করে বদলির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে কবে নাগাদ আদেশ হবে বা তালিকার ৪৯ জনের সবাইকে বদলি করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থা তালিকা করেছি বলে শুনেছি। তালিকায় থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।