Image description

আসামের ধুবড়ির চাপরে কয়েকবছর আগেও ছিল ঘরবাড়ি, উঠান, গবাদি পশু, মানুষের কোলাহল। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে একাধিকবার ঘর হারানো পরিবারগুলোর অনেকেই সেখানে তিন থেকে চার দশক ধরে বসবাস করছিলেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সেই ঘরগুলোই বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয় আসাম সরকার। উচ্ছেদ হয় ১৪০০-র বেশি বাংলাভাষী মুসলিম পরিবার। সংখ্যায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ। আর এর এক বছর না পেরোতেই সেই জমিতে শুরু হল আদানি পাওয়ারের ৩২০০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ।

চাপরের চারুবাখরা, চিরাকুটা ১ ও ২ এবং সন্তোষপুর এলাকায় ২০ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের এই প্রকল্পকে রাজ্যের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প বলে জানিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। প্রথম ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০৩০ সালের ডিসেম্বর থেকে।

এই প্রকল্পের জমি ঘিরেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। উচ্ছেদ হওয়া বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারগুলোর অভিযোগ, ঘর ভাঙার পরে তাদের পুনর্বাসন হয়নি।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩৫০০ বিঘা সরকারি জমি খালি করা হয়। পাশাপাশি জমির কাগজ থাকা বাসিন্দাদের প্রায় ১৭০০ বিঘা জমিও প্রকল্পের কাজে নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় মুসলিমদের দাবি। তাদের বক্তব্য, কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও প্রায় অর্ধেক জমির মালিক ক্ষতিপূরণ পাননি।

অন্যদিকে পুনর্বাসনের জন্য বাইজার আলগা এলাকায় ৩০০ বিঘা জমি দেওয়া হয়েছিল। মালপত্র সরানোর জন্য পরিবারপিছু এককালীন ৫০ হাজার টাকার কথাও জানানো হয়। কিন্তু অনেকের আপত্তি, ওই এলাকা ব্রহ্মপুত্রের মাঝের নিচু জমি। বর্ষায় সেখানে জল ঢোকার আশঙ্কা থাকে। তাই সেখানে যেতে নারাজ তারা।

এদিকে, পরিবেশগত ছাড়পত্রের নথিতে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, প্রকল্প এলাকায় কোনো বসতি নেই এবং পুনর্বাসন বা পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোনো দাবি নেই। অথচ উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের ঘরবাড়ি ভেঙেই জমি খালি করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি ১৪ জুলাই প্রকল্পটির পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার সুপারিশ করে। সরকারি নথিতেও প্রকল্পের জন্য ৫৮৫ হেক্টর জমির কথা রয়েছে।

এই ঘটনা আসামে উচ্ছেদের পুরনো বিতর্কও আবার সামনে এনেছে। ২০১৬ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন জেলায় উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে।

একাধিক ঘটনায় বাংলা- ভাষী মুসলিম পরিবারই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় উঠে এসেছে। বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযানে অন্তত ৮ জন মুসলিম নিহত হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে একটি মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্টে। ২০২১ সালের দরংয়ের উচ্ছেদে পুলিশি গুলিতে দু’জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৪ সালে কামরূপে উচ্ছেদ ঘিরে আরও দু’জন নিহত হন।

এমনকি চলতি সেপ্টেম্বরেও গোলপাড়ায় ৭৩ টি বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারের বাড়ি ভেঙে দেওয়া নিয়ে গৌহাটি হাইকোর্ট প্রশ্ন তুলেছেন। আদালত জানিয়েছেন, নিজেদের কৃষি-জমিতে তৈরি বাড়ি ভাঙার আগে বাসিন্দাদের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়নি।