Image description

বাংলাদেশ বন্দর খাতের আধুনিকায়নে বড় ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এর আওতায় নতুন গভীর সমুদ্রবন্দর ও কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি ড্রেজিং, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, ডিজিটালাইজেশন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের উন্নয়ন করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য দেশের বাণিজ্য অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নথি অনুযায়ী, পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানো, জাহাজ পরিচালনার দক্ষতা উন্নত করা, ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বন্দরের ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা বাড়াতে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।

এই বৃহত্তর পরিকল্পনার আওতায় সমুদ্র ও স্থলবন্দর উন্নয়ন, নদীবন্দর ও লঞ্চ টার্মিনালের আধুনিকায়ন, অভ্যন্তরীণ নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।

বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের প্রায় ৯৫ শতাংশ চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য এসব বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম বন্দরে বাড়ছে চাপ

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েক বছর ধরে পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

জুলাইয়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বন্দরটি ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫২ হাজার টন পণ্য এবং ৩৪ লাখ ৯ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। ২০১০ সালে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৯৬ হাজার টন এবং ১৩ লাখ ৪৩ হাজার টিইইউ।

তিনি বলেন, আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ, পণ্য হ্যান্ডলিং ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিং ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।বন্দরটি সপ্তাহের সাত দিনই ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। এর সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল চালু করা, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়ন, নিয়মিত ক্যাপিটাল ও রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং, নতুন পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং বন্দরের সেবাগুলো ডিজিটালাইজেশন করা।

এ ছাড়া ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং পণ্য খালাসের গতি বাড়িয়ে কনটেইনার জট কমাতেও সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে।

জুলাইয়ে সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাস ও সরবরাহ কার্যক্রমের প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশও ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার কাজ চলছে।

সরকার বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো ও অফডকের মাধ্যমে আমদানি করা কনটেইনার সরবরাহে উৎসাহ দিচ্ছে। এ ছাড়া বন্দরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ১০ হাজার টিইইউর বেশি কনটেইনার নিলামের মাধ্যমে খালাস করে ইয়ার্ডের জায়গা খালি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বড় জাহাজ জন্য বে টার্মিনাল

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম বে টার্মিনাল দেশের সামুদ্রিক বন্দর সম্প্রসারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই টার্মিনালে বড় মাদার ভেসেল সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারবে। এতে ট্রান্সশিপমেন্ট খরচ কমবে এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের গতি বাড়বে।

বর্তমানে নাব্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক বড় জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না।

মন্ত্রী বলেন, দুটি স্থাপনার কাজ শেষ হলে ১২ থেকে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ সেখানে প্রবেশ করতে পারবে। সরাসরি জাহাজ ভেড়ানোর মাধ্যমে জাহাজের অপেক্ষার সময়ও কমবে।

লালদিয়া টার্মিনালে বাড়ছে সক্ষমতা

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের পরিকল্পিত সম্প্রসারণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশের অন্যতম বড় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) বিনিয়োগে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে আগস্টে শুরু হয়েছে। এতে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

ডেনমার্কের সহযোগিতায় টার্মিনালটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে বন্দরের কার্যক্রমে আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম সংসদে বলেন, কনসেশন চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পটির নির্মাণকাজের মেয়াদ তিন বছর এবং পরিচালনার মেয়াদ ৩০ বছর। আরও ১৫ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

সরকার এই টার্মিনালকে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বন্দর খাতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক পরিচালন পদ্ধতি আনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখছে।

মাতারবাড়ীতে খুলছে গভীর সমুদ্রবন্দরের সুযোগ

কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের সামুদ্রিক অবকাঠামোয় আরেকটি বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।

নির্মাণাধীন বন্দরটি ২০২৯ সালের মধ্যে চালু হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী।

বন্দরটির নেভিগেশন চ্যানেলের গভীরতা হবে প্রায় ১৬ মিটার। সেখানে প্রায় ৮ হাজার ২০০ টিইইউ কনটেইনার বহনকারী জাহাজ বা সর্বোচ্চ ১ লাখ ডেডওয়েট টনের পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ানো যাবে। মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজ বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে যেসব জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়, সেগুলোর তুলনায় প্রায় চার গুণ বড়।

এই বন্দর চালু হলে বড় মাদার ভেসেল সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরে আসতে পারবে। এতে কলম্বো, সিঙ্গাপুর ও পোর্ট ক্ল্যাংয়ের মতো বিদেশি ট্রান্সশিপমেন্ট হাবের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকার আশা করছে, এর ফলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ট্রান্সশিপমেন্ট-সংক্রান্ত লজিস্টিক খরচ কমবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

মাতারবাড়ী আঞ্চলিক ট্রানজিট ও বাণিজ্যের সুযোগও তৈরি করতে পারে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

দ্বিতীয় প্রবেশদ্বার হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে মোংলা

বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে ভূমিকা বাড়াতে মোংলা বন্দরেরও বড় ধরনের সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বন্দরের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরে সর্বোচ্চ ৮ লাখ টিইইউ কনটেইনার, ৪০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য এবং ৩০ হাজার যানবাহন হ্যান্ডলিং করা যাবে।

অতিরিক্ত ছয়টি জেটির মধ্যে দুটির নির্মাণকাজ চলছিল। এসব কাজ শেষ হলে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বছরে ১৫ লাখ টন পণ্য এবং ৪ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পায়রাতেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার

পায়রা বন্দরও সরকারের সামুদ্রিক উন্নয়ন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম জুনে সংসদে বলেন, নাব্যতা নিরবচ্ছিন্ন রাখা ও বন্দরের কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে রাবনাবাদ চ্যানেলে রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং এবং দুটি ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ সমুদ্রবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

পরিকল্পিত ড্রেজিং বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পলি জমে থাকা নদীবিধৌত পরিবেশে অবস্থিত এই বন্দরের চ্যানেলে প্রয়োজনীয় গভীরতা বজায় রাখা একটি চলমান চ্যালেঞ্জ।

জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ড্রেজিং

সরকারের নৌপরিবহন কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে ড্রেজিং।

বন্দর চ্যানেলের পাশাপাশি সরকার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননেরও বড় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

সংসদে দেওয়া এক ঘোষণায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রচলিত বন্দর থেকে স্মার্ট বন্দরের পথে

ডিজিটালাইজেশনও আধুনিকায়ন কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, কাগজবিহীন বন্দর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে অনলাইন পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম, ই-ডেলিভারি অর্ডার, ই-পেমেন্ট সেবা, ই-গেট পাস, সিপিএ স্কাই এবং পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো চালু করা হচ্ছে।

সরকার বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করার পাশাপাশি অতিরিক্ত পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহের উদ্যোগও নিয়েছে।

মানবসম্পদ ও নিরাপত্তা

আধুনিকায়ন পরিকল্পনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সরকার জাহাজ নিবন্ধন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নাবিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা করছে।

 

অভ্যন্তরীণ নৌপথের নিরাপত্তাও সরকারের আরেকটি অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে নদীবন্দর ও লঞ্চ টার্মিনাল আধুনিকায়ন এবং নৌযান চলাচলের সহায়ক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নৌপথে চলাচলকারী নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।