রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু প্রধান সড়ক পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমনকি ফ্লাইওভার বা এক্সপ্রেসওয়েতেও দেখা যাচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ এসব যানবাহন। এসব তিন চাকার যানের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। বেপরোয়া গতি আর হঠাৎ লেন পরিবর্তনে সড়কে আতঙ্কে থাকতে হয় পথচারী ও অন্য যানবাহনের চালকদের।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছুদিন পরপরই ট্রাফিক পুলিশের অভিযানের খবর আসে। তবে এতে সমাধান মিলছে না। এ কারণে অটোরিকশার লাগাম টানতে নতুন নিয়ম আনতে যাচ্ছে সরকার। সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত ও অবৈধ অটোরিকশাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে আনার কাজ চলছে। আমরা চাই না রাতারাতি বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়ুক। তাই নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এদের শহর ও মূল সড়ক থেকে সরিয়ে সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলায় আনা হবে।’
নতুন নীতিমালায় যানবাহনের নকশা, রুট নির্ধারণ, চালকের যোগ্যতা, ফিটনেস ও কারিগরি মানদণ্ডের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, যত্রতত্র চলাচল ও দুর্ঘটনা রোধে অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসতে বিধিমালা প্রণয়ন প্রায় চূড়ান্ত। এর আওতায় যে কোনো জাতীয় মহাসড়কে এগুলোর চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। প্রতিটি অটোরিকশাকে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ডিজিটাল নিবন্ধন ও কিউআর কোডযুক্ত লাইসেন্স নিতে হবে।
নিরাপত্তার স্বার্থে চালকদের জন্য ন্যূনতম বয়স, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও নির্দিষ্ট রঙের ইউনিফর্ম পরা বাধ্যতামূলক করা হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ গতিসীমা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব রিচার্জেবল ব্যাটারি ব্যবহার এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ব্যবহারের কঠোর নির্দেশনা থাকছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে বা গাড়ি ডাম্পিং করে সমস্যার সমাধান হবে না। এর সঙ্গে চার্জিং ব্যবস্থা, নিবন্ধন, জিপিএস ও জিওফেন্সিংয়ের মতো বিষয় যুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’
যারা গ্যারেজ করেছেন কিংবা করবেন তারা যেন একটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি অটোরিকশা গ্যারেজে রাখতে পারেন; তার ওপরও জোর দেন এই কর্মকর্তা। তার মতে, এক এনআইডির বিপরীতে এর অতিরিক্ত একটি রিকশাও যেন রাখা না যায় সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমানে রাজধানীতে ঠিক কতটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে, তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন বা ট্রাফিক পুলিশ কারও কাছেই এ তথ্য নেই।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) নিবন্ধিত রিকশা ১ লাখ ৮২ হাজার ৬৩০টি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ২৮ হাজার ১৫২টি। এই নিবন্ধিত মোট ২ লাখ ১০ হাজার ৭৮২টি রিকশার সবগুলোই প্যাডেলচালিত।
লাইসেন্সবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ অটোরিকশার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে পুলিশের অভিযানে ক্ষুব্ধ অটোচালকরা। তাদের একাধিক সংগঠনও রয়েছে। সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের কাছে সাত দফা দাবি তুলে ধরে জাতীয় রিকশা-ভ্যানচালক শক্তি।
সড়কে বিশৃঙ্খলা
মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকদের জন্যে অটোরিকশা এখন নিত্যদিনের আতঙ্ক। হঠাৎ লেন পরিবর্তন, আচমকা ইউটার্ন, উল্টোপথে যানবাহন ঢোকাসহ নানা কারণে তৈরি হচ্ছে সমস্যা।
মোটরসাইকেল চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বেশিরভাগ রিকশাচালকই ট্রাফিক আইন জানেন না। লেনের নিয়ম না জেনে সরাসরি বড় ও দ্রুতগতির গাড়ির লেনে ঢুকে পড়েন। রিকশায় লুকিং গ্লাস, ইন্ডিকেটর না থাকায় পেছনে দ্রুতগতির গাড়ি আসছে কি না; তা না দেখেই চালকরা মোড় নেন। অনেকবার এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছি।’
প্রাইভেটকার চালক সাহেদ আলী বলেন, ‘আমি স্বাভাবিকভাবে যাচ্ছি, হঠাৎ করেই বাম থেকে ডানে ঢুকে আমার গাড়িতে লাগিয়ে দিল। তাদের ব্রেকিং সিস্টেম ঠিক না থাকলেও গতি কোনোভাবেই কমায় না। সিগনালেরও তোয়াক্কা করে না। আমরা ট্যাক্স দেই, সবকিছু মানি। দিনশেষে ট্রাফিক আইন ভাঙে ওরা, আবার মামলা হয় আমাদের নামে। এভাবে তো চলা যায় না।’
রাজধানীতে অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা কত সেটিও স্পষ্ট নয়। জাতীয় রিকশা-ভ্যানচালক শক্তির তত্ত্বাবধায়ক ও জাতীয় শ্রমিক শক্তির যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ ইসাহাক বলেন, ‘সঠিক সংখ্যা আসলে কেউ বলতে পারবে না। তবে আমাদের ধারণা, ঢাকা শহরে এর সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ লাখের মধ্যে হবে। আর সারা দেশে ৬০ লাখের বেশি হতে পারে।’
সমাধান চান শ্রমিক নেতারাও
ঢাকার অটোচালকদের বড় অংশই দৈনিক ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজ এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাবে রাজধানীতে পাড়ি জমান তারা।
রংপুরের গঙ্গাচরা থেকে আসা এক চালক বলেন, ‘এলাকায় কাজ থাকে অল্প কিছুদিন, তারপর বেকার। নিজের জমিজমাও নেই যে, চাষবাস করব। বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসা লাগে। আর ঢাকায় এলেই তো কাজ জোটে না। তাই অটোরিকশা চালাই। প্যাডেল রিকশা চালালে কেউ উঠতে চায় না, পরিশ্রমও বেশি। অটোতে দ্রুত চলাচল করা যায়, ভাড়াও বেশি পাওয়া যায়। তবে মূল সড়কে উঠলে ভয়ে থাকা লাগে, কখন আবার ব্যাটারি খুলে নেয়।’
কামরাঙ্গীরচরের গ্যারেজ মালিক শাহাবুদ্দিন শাবুর ধারণা, ঢাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ হাজারের বেশি রিকশা গ্যারেজ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত দুই বছরে অনেক নিম্নবিত্ত মানুষ ও বেকার তরুণ এটার মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। তবে বেশিরভাগ গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় আমরাও সমস্যার মুখে পড়ি। মাঝেমধ্যেই শুনি, গাড়ি ডাম্পিংয়ে গেছে। স্পষ্ট নীতিমালা থাকলে প্রশাসনিক হয়রানি ছাড়াই শান্তিতে ব্যবসা করতে পারতাম।’
নিয়ন্ত্রণচেষ্টার অংশ হিসেবে মাঝেমধ্যেই মহাসড়কে রিকশা ডাম্পিংয়ের কার্যক্রম চালায় ট্রাফিক পুলিশ। ঠিক সে সময়েই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে ছোট ছোট আন্দোলন গড়ে ওঠে। এগুলোর নেতৃত্বে থাকেন শ্রমিক নেতারা।
সম্প্রতি অটোরিকশা উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করে জাতীয় রিকশা-ভ্যানচালক শক্তি। সংবাদ সম্মেলন করে তারা সরকারের কাছে বেশকিছু দাবি জানায়। এর মধ্যে রিকশা উচ্ছেদ ও হয়রানি বন্ধ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নগর পরিকল্পনার ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণয়ন, স্বল্পমূল্যে প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন, দুর্ঘটনা বিমা, স্বাস্থ্যবিমা ও বার্ধক্যকালীন ভাতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
একই ধরনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন বলেন, ‘১৩ বছর ধরে এই বিষয়ে কাজ করে আসছি, যাতে এগুলোকে একটি কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসা হয়। সম্প্রতি সরকারের কাছে ১০টি দাবি জানিয়েছি। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, যানজট নিরসন, গাড়ি, চালক ও যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সমন্বিত নীতিমালা ও বিধিমালা প্রণয়ন, যানবাহনের নিবন্ধন, চালকদের লাইসেন্স, রুট পারমিট প্রদানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাবি এতে অন্তর্ভুক্ত আছে।’
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এই সংকট মোকাবিলায় অটোরিকশা বন্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের নতুন বিধিমালা দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সড়কে অটোরিকশার ক্রমবর্ধমান সংকট নিরসনের মূল সমাধান লুকিয়ে আছে সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। কোনোভাবেই অটোরিকশা বন্ধের মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব নয়। ঢালাওভাবে বন্ধ করে দিলে এ সমস্যা আরও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে। একটি আধুনিক শহরের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা মূলত একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। তাই সমাধান হিসেবে অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে কিংবা চুপচাপ বসে না থেকে একে সুনির্দিষ্ট নীতি ও আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের তৈরি করা প্রস্তাবিত বিধিমালাটি অত্যন্ত চমৎকার ও সামষ্টিক রূপরেখা। এটি যত দ্রুত সম্ভব অনুমোদন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এই বিধিমালায় অটোরিকশার উৎপাদন থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে চলাচল, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কতগুলোর মালিক হতে পারবেন এবং যানবাহনটির অর্থনৈতিক মেয়াদকাল নির্ধারণের বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। নিবন্ধনের আগে যানবাহনের টেকনিক্যাল ফিটনেস নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে একক ক্ষমতা না দিয়ে বুয়েট, অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মতো কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে একটি সুন্দর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স রাখা হয়েছে।’
ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘অতীতে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনীতি হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সমস্যাটি আজকের পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে দ্রুত সরকার এটি অনুমোদন না দিলে প্রতিদিন সড়কে মানহীন ও স্পেসিফিকেশন ছাড়া নতুন অটোরিকশা নামতে থাকবে। এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। দ্রুত এই বিধিমালা কার্যকর করার মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব।’