দুই দশক পরও খালেদা জিয়ার চিঠি যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছেন বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাইফুল্লাহ। সময় পেরিয়ে শৈশবের সেই স্মৃতি তার জীবনে এখন বড় অনুপ্রেরণার গল্প কিংবা স্বীকৃতির দলিল। দুই দশক আগে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া শিশু ছাইফুল্লাহর হাতে পৌঁছেছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর করা এমনই একটি চিঠি।
গত ২০০৪ সালের ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো সেই চিঠিতে লেখা ছিল—‘তোমরাই জাতির ভবিষ্যৎ।’ সঙ্গে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল দুটি বই।
সময়ের স্রোতে সেই শিশু আজ বড় হয়েছে, বদলে গেছে জীবনের অনেক কিছুই কিন্তু শৈশবে পাওয়া প্রধানমন্ত্রীর সেই চিঠিটি আজও সযত্নে আগলে রেখেছেন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বাসিন্দা মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ্।
চিঠির শেষে স্বাক্ষরের আগে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শিশুদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন যে বাক্যে তা ছিল—‘তোমাদের আপনজন।’ সেই চিঠিটি ২২ বছর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ লিখেছেন— ‘সেই থেকে বেগম জিয়া হয়ে উঠলেন একান্ত কাছের একজন।’
প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের উৎসাহিত করা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি দেওয়ার সেই সময়ের উদ্যোগগুলোর একটি ব্যক্তিগত স্মারক হয়ে আছে ছাইফুল্লাহর কাছে থাকা বেগম জিয়ার সেই চিঠি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে একটি শিশুর কাছে পৌঁছে দেওয়া ওই বার্তায় শুধু একটি বৃত্তির সাফল্যকে অভিনন্দন জানানো হয়নি; বরং তাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছিল।
চিঠিটি শুরু করা হয় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে। তারপর লেখা হয়—
‘প্রিয় মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ্,
আমার স্নেহ ও শুভেচ্ছা নিও। আমি জেনে খুশি হয়েছি ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত বৃত্তি পরীক্ষায় তুমি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছো। তোমার সাফল্যে পরিবারের অন্যান্য প্রিয়জনের মতো আমিও খুশি হয়েছি। তাই আমি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে তোমাকে দুটি বই উপহার হিসেবে পাঠালাম। আশা করি, এ উপহার তোমাকে বই পড়ায় আরো উৎসাহিত এবং আলোকিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
তোমরাই জাতির ভবিষ্যৎ। আমি আশা করি, নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে তুমি আরো মনোযোগী হয়ে লেখাপড়া করবে। আমি তোমার ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করি।’ তোমাদের আপনজন, তারপর (স্বাক্ষর) দেওয়া হয়।
বর্তমানে চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় পত্রিকায় সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ্ চিঠিটি পোস্ট করে আরও লিখেছেন, ‘২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার এই অসাধারণ কাজটি করেছিল। জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় যারা ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেত তাদের বইয়ের সাথে এই চিঠিটি পাঠাতো। এটি প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর সংবলিত চিঠি।
কি যে অনুপ্রেরণাদায়ী ছিল উদ্যোগটি। আমার কিশোর মনে সেই যে নাড়া দিয়েছিলেন বেগম জিয়া আর কখনও পর হননি, আপন মানুষ হয়েই থেকে গেলেন; এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরও। আশা করি, এই বিএনপি সরকার একই কাজটি পুনরায় করবে।’
ছাইফুল্লাহ জানায়, কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠ’ থেকে ২০০৩ সালের বৃত্তি পরীক্ষায় জেলা পর্যায়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করে।
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিঠি পাওয়ার স্মৃতিচারণ করে ছাইফুল্লাহ বলেন, ‘জুনিয়র বৃত্তির রেজাল্ট হয়েছে কিছুদিন আগে। একদিন ক্লাস চলাকালে হেডস্যার (প্রয়াত নুরুল কবির) ক্লাসে উপস্থিত হন। তাঁর চোখেমুখে আনন্দের রেশ।
তিনি গমগমে গলায় বললেন-এ বছর যারা ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেছ তারা সবাই অফিসে চলে এসো, তোমাদের জন্য একটি বিশেষ সারপ্রাইজড আছে। আমরা হেডস্যারের পিছু পিছু গেলাম।
স্যারের টেবিলে খুব সুন্দর কিছু প্যাকেট সাজিয়ে রাখা ছিল। হেডস্যার আমাদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বললেন- ‘প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তোমাদের জন্য উপহার পাঠিয়েছেন। খুব মূল্যবান উপহার। বই আর চিঠি।’
‘আমরা আনন্দে শিক্ষকদের কদমবুছি করলাম। পরে স্যাররা আমাদের হাতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের প্যাকেট তুলে দিলেন। সেই প্যাকেট বাসায় নিয়ে খোলার ধৈর্য আমাদের নেই।
ক্লাসে গিয়ে খুলে দেখি। নিচে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর। কী সুন্দর টানা টানা সেই লেখা! সেদিন আমার কিশোর মনে বেগম জিয়া নামে একজন মানুষ যে জায়গা করে নিয়েছিলেন সেটি আর কখনও নড়চড় হয়নি।’