হবিগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো। জেলার ৯টি উপজেলায় ১ হাজার ৫২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২২৮টিতে নেই প্রধান শিক্ষক। সহকারী শিক্ষকেরও ৩২১টি পদ শূন্য। এর মধ্যে ২০টি বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে কোথাও শিক্ষকসংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, আবার কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করতে গিয়ে নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের ২২৮টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৩২১টি পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে প্রায় অর্ধেক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্ব দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
চলতি দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের একদিকে দাপ্তরিক কাজ সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক দায়িত্বের অতিরিক্ত চাপের কারণে পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সদর উপজেলায় ১১৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৩টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। নবীগঞ্জে ১৮২টির মধ্যে ৩৮টি, লাখাইয়ে ৭২টির মধ্যে ১৪টি, বানিয়াচংয়ে ১৬৭টির মধ্যে ৩৬টি, আজমিরীগঞ্জে ৬৫টির মধ্যে ১৪টি, মাধবপুরে ১৪৯টির মধ্যে ২৬টি, চুনারুঘাটে ১৭০টির মধ্যে ৩০টি, বাহুবলে ১০৩টির মধ্যে ২৭টি এবং শায়েস্তাগঞ্জে ২৯টির মধ্যে ১০টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৫ হাজার ৪৩০টি। এর মধ্যে ৩২১টি পদ শূন্য। নবীগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ১৮২টি পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া সদরে ৪৭টি, লাখাইয়ে ২০টি, বানিয়াচংয়ে ৩০টি, আজমিরীগঞ্জে ২০টি, মাধবপুরে ৪৪টি, চুনারুঘাটে ৫৫টি, বাহুবলে ৪২টি এবং শায়েস্তাগঞ্জে ১০টি পদ শূন্য রয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মামলার কারণে ১০টি পদে নিয়োগ বা পদোন্নতি আটকে আছে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় জটিলতা থাকায় শূন্যপদের সংখ্যা কমছে না।
অন্যদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ‘জরুরি শিক্ষা’ খাতের চাহিদাপত্র অনুযায়ী, জেলার ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। কোথাও দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় ফাটল। এসব ভবনে শ্রেণি কার্যক্রম চালানোয় শিক্ষার্থীদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে।
চলতি দায়িত্বে থাকা কয়েকজন শিক্ষকের ভাষ্য, প্রধান শিক্ষক না থাকায় দাপ্তরিক কাজের চাপ বেড়েছে। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতি না হলে শিক্ষার মান ধরে রাখা কঠিন হবে। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হকের মতে, একটি বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকা এবং সহকারী শিক্ষকের ঘাটতির কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ আলম জানান, মামলা জটিলতা ও দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। আপাতত চলতি দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তার আশা, দ্রুতই শূন্যপদ পূরণ হবে।