Image description

অপরাধী ধরার দায়িত্ব পুলিশের। মাদকসহ নানা অবৈধ সামগ্রী জব্দ করার কাজও তাদের। নিয়মিত এসব কাজ করছেন তারা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক যেমন জব্দ করছেন তেমনি মাদকসহ ধরাও পড়ছেন পুলিশ সদস্যরা। আবার কারও কারও শরীরে পাওয়া যাচ্ছে মাদকের উপস্থিতি। প্রমাণ হওয়ায় চাকরি হারাচ্ছেন অনেকে। আবার কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছেন মাদক মামলায়। ব্যাপারটা যেন, ‘সরষের মধ্যে ভূত’ এর মতো।

সবশেষ সেনাবাহিনীর একটি কোর্সে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশ সুপার নিজাম উদ্দীনের শরীরে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। ২০২০ সালের পর থেকে সাত বছরে দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্য ডোপ টেস্টে পজিটিভ হলেও এসপি নিজামের এই ঘটনায় রীতিমতো ইমেজ সংকটে পড়ছে পুরো বাহিনী। মাদক মামলায় একের পর এক পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তারে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসনও। এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ‘ডোপ টেস্ট’ বাস্তবায়নের তাগিদসহ মাদকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে পাঠানো হয়েছে বিশেষ নির্দেশনা।

বিব্রত পুলিশ

রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত পুলিশ সুপার (টিআর) এ এফ এম নিজাম উদ্দিন গত ৮ জানুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ডিএসসিএসসি-২০২৬ কোর্সে যোগ দিতে মিরপুর সেনানিবাসে যান। ৭ জুন অসুস্থ হয়ে সিএমএইচে ভর্তি হন তিনি। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষার অংশ হিসেবে ডোপ টেস্ট করা হলে তার শরীরে বেনজোডায়াজেপিন এবং অ্যামফিটামিন/মেথামফিটামিন শনাক্ত হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে গত বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপন জারি করে জননিরাপত্তা বিভাগ।

ডোপ টেস্ট-সংক্রান্ত তথ্যের খোঁজ নিতেই জানা গেল, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত শুধু কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পর্যন্ত দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্যের এই পরীক্ষার ফল পজিটিভ এসেছে। যাদের মধ্যে বরখাস্ত হয়েছেন ১৩৪ জন। চলতি মাসেও বরিশালের গৌরনদীতে এক কনস্টেবল ডোপ টেস্টে পজিটিভ হন। গত ছয় মাসে বরিশালে আরও তিনজন ডোপ টেস্টে পজিটিভ হন।

এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার এ জেড এম মোস্তাফিজুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘মাদকের ব্যাপারে আমি সব সময়ই জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল থাকতে চাই। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমি বিষয়টি আমার সঙ্গে কর্মরত সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তাদের আমি ডোপ টেস্টের মুখোমুখি করি। এ পর্যন্ত চারজন পজিটিভ হয়েছেন। তারা সবাই কনস্টেবল পদমর্যাদার। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।’

দুই ধাপে ডোপ টেস্ট

পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্ট সাধারণত দুই ধাপে করা হয়। প্রথমে পুলিশ হাসপাতালে পরীক্ষা করা হয়। কোনো জেলায় পুলিশ হাসপাতাল না থাকলে কাছের জেলার পুলিশ হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। রক্ত ও প্রস্রাবের নমুনা নেওয়া হয়। এরপর নমুনা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমেও পরীক্ষা করা হয়। দুই পর্যায়ের পরীক্ষায় মাদক গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নিয়োগের সময়ও ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক। তবে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর বা আদৌ করা হয় কি না, তা নিয়েই এখন উঠেছে প্রশ্ন। তা ছাড়া, ডোপ টেস্ট করাতে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অনীহাও রয়েছে, বলছেন সংশ্লিষ্টরাই।

কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানালেন, ২০২৩ সাল থেকে অনেকটা মন্থর গতিতে চলছিল বাহিনীতে ডোপ টেস্টের কার্যক্রম। এএসপি থেকে তার ওপরের কর্মকর্তাদেরও ডোপ টেস্টের আওতায় নেওয়ার দাবি উঠলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিষয়টি চলে যায় আলোচনার বাইরে। ডোপ টেস্টের গতিও ‘রহস্যজনকভাবে’ কমে আসে।

মাদক কারবারেও পুলিশ

শুধু ডোপ টেস্ট নয়, সরাসরি মাদকসহ গ্রেপ্তারের ঘটনাও সামনে আসছে। ৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে ১৬ এপিবিএনের সদস্য মোহাম্মদ আলী মুন্না শিকদারকে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে বিজিবি। তার মোটরসাইকেলে বিশেষভাবে তৈরি করা গোপন কুঠুরি থেকে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়। সঙ্গে ছিল দুটি আইফোন ও নগদ টাকা। তিনি ছুটিতে ছিলেন। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। এর আগে ২৩ আগস্ট ঢাকার উত্তরা এলাকায় ৫ হাজার ৩১০টি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন ডিএমপির পল্লবী থানার এএসআই মো. শফিকুল ইসলামসহ দুজন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ইয়াবাবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে জব্দ করা মাদক আবার বিক্রি করতেন।

সবশেষ গত সোমবার সাতক্ষীরায় মাদকবিরোধী অভিযানে ৫৬ বোতল ‘কোরেক্স’সহ দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তারা হলেন সাতক্ষীরা পুলিশ লাইনের বিশেষ শাখার সদস্য মোস্তাইন বিল্লাহ এবং ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কম্পিউটার অপারেটর নাজমুল ইসলাম।

আইজিপির কঠোর বার্তা

গত ১২ মে রাজারবাগে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেছিলেন, মাদক দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো পুলিশ সদস্য মাদক সেবন বা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

এরপরেও বারবার পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে উঠছে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, মাদকের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। কোনো সদস্য জড়িত থাকলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়মিত মামলাও হতে পারে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ডও হতে পারে। তার ভাষায়, ‘ব্যক্তির দায় বাহিনী নেবে না’।

পুলিশের কোনো সদস্য মাদকচক্রের সহযোগী হয়ে উঠলে তাকে পুরো ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন,  ‘দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনভাবে ফৌজদারি তদন্তও হওয়া প্রয়োজন। মাদকবিরোধী লড়াইয়ে পুলিশের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাহিনীর ভেতরের একটি অংশের মাদক সম্পৃক্ততা শুধু শৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এটি মাদকবিরোধী পুরো অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও সৃষ্টি করছে।’ তিনি আরও বলছিলেন, ‘কোনো সদস্যের জীবনযাপন হঠাৎ বদলে গেলে, অস্বাভাবিক সম্পদ গড়ে উঠলে কিংবা সন্দেহজনক ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে তা নজরে আনা প্রয়োজন। শুধু ডোপ টেস্ট নয়, মাদক কারবার বা চোরাচালানের সঙ্গে আর্থিক সম্পৃক্ততা আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা দরকার।’