পূজার আগে বাংলাদেশের ইলিশের জন্য যখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের হা-পিত্যেস, তখন সেই দেশের গুজরাট রাজ্য থেকে ইলিশ আসার খবর আলোচনায়।
এ অর্থ বছরের শুরু থেকে এই পর্যন্ত সাড়ে ৩ লাখ কেজি ইলিশ ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে বলে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।
তবে গুজরাটের তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, এই রাজ্যে ইলিশ মাছ আহরণ বাংলাদেশের দেড় শতাংশের মতো। অর্থাৎ বাংলাদেশে আহরণের তুলনায় গুজরাটের আহরণ এক অর্থে কিছুই না।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। ২০১৭ সালে ইলিশ মাছকে ভৌগোলিক নির্দেশক (এও) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বিশ্বের ইলিশ আহরণের ৮৫ শতাংশই হয় বাংলাদেশে। দেশে যত মাছ ধরা পড়ে, তার ১২ শতাংশই হলো ইলিশ। বাংলাদেশের জিডিপিতে ইলিশের অবদান ১ শতাংশ।
লোনা জলের সাগরের মাছ ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মিঠা পানির নদীতে আসে। তখনই বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। এছাড়া সাগরে ইলিশ শিকার হয়।
বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫ লাখ টন ইলিশ নদী, উপকূল ও অগভীর সমুদ্র থেকে আহরণ করা হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য দেখাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ইলিশ আহরণ ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন। তার মধ্যে সাগর থেকে ধরা হয় ২ লাখ ৮১ হাজার মেট্রিক টন, নদী থেকে ২ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন।
২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ইলিশ আহরণ খানিকটা কমে যাওয়ার চিত্র দেখাচ্ছে মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান। গত অর্থ বছরে মোট আহরণ হয়েছিল ৫ লাখ মেট্রিক টন। তার মধ্যে সাগর থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন, নদী থেকে ২ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন।
ইলিশ শিকারে বিশ্বে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে ভারত ও মিয়ানমার। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান জানার পর ভারতের গুজরাটে আহরণের তথ্যে চোখ রাখলে তা যে কত কম, তা বোঝা যায়।
গুজরাট রাজ্য সরকারের মৎস্য কমিশনারের কার্যালয়ের তথ্য দেখাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সেখানে ইলিশ আহরণ ছিল ৮ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন।
একই সময়ে বাংলাদেশে আহরণ ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ বাংলাদেশে ওই অর্থ বছরে গুজরাটের তুলনায় ৬৫ গুণ বেশি ইলিশ ধরা পড়েছে।
গুজরাটের মৎস্য কমিশনারের কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অবশ্য দেখাচ্ছে, ভারত মহাসাগর রাজ্যটিতে ইলিশ আহরণ আগের তুলনায় বেশ বাড়ছে।
২০০৮-০৯ অর্থ বছরে রাজ্যটিতে ইলিশ ধরা পড়েছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ টন। ২০১০-১১ অর্থ বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৫৫ টনে। এরপর আবার কমে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে হয় ১ হাজার ৭৯৫ টন।
২০২০-২১ অর্থ বছরে ইলিশ আহরণ এক লাফে বেড়ে হয় ১১ হাজার ৪ টন, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে তা ১৪ হাজার টন ছাড়িয়ে যায়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে আহরণ আবার কিছুটা কমে আসে।
ইলিশ ধরা বাড়লেও গুজরাটে মোট সামুদ্রিক মাছ আহরণের তুলনায় ইলিশ আহরণ এখনো সামান্য। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রাজ্যটিতে মোট সামুদ্রিক মাছ ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৪ হাজার ৮২৮ টন।
বঙ্গোপসাগরের বিপরীতে আরব সাগর পাড়ের গুজরাটে ইলিশের প্রধান বিচরণক্ষেত্র নর্মদা নদীর মোহনা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নবসারি, ভলসাড, সোমনাথ ও পোরবন্দরেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ছে।
২০২২-২৩ সালের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে নবসারিতে, ৪ হাজার ৭০৬ টন। এরপর সোমনাথে ৩ হাজার ৬৭৮, পোরবন্দরে ২ হাজার ৫৩৮ এবং ভলসাডে ২ হাজার ৫১০ টন ইলিশ ধরা পড়ে।
বাংলাদেশের বেনাপোল ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের তথ্যের বরাতে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে তথ্য এসেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের প্রথম দুই মাসে এই স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ২২৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে।
এর মধ্যে জুলাই মাসে ২৯ হাজার ৮৮০ কেজি আসার পর আগস্টে তা বেড়ে হয় ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি বা ৩২৩ মেট্রিক টন। বেসরকারি মোট ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এই মাছ আমদানি করেছে ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকায়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ইলিশ আসছে কোত্থেকে? পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রগুলোতে লেখা হচ্ছে, গুজরাট থেকে বাংলাদেশে যাচ্ছে ইলিশ।
তবে বাংলাদেশের মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকের সন্দেহ, গুজরাট নয়, এই ইলিশ আসলে মিয়ানমারের। সেখান থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসছে।
এই সন্দেহের ভিত্তি অবশ্য রয়েছে। গত বছরে জুলাই মাসে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের ইলিশে কলকাতার মানুষের রসনা বিলাসের কথা বলা হয়েছিল। তখন হাওড়ারি মাছের পাইকারি বাজার সমিতির সেক্রেটারি সৈয়দ আনওয়ার মাসুদ বলেছিলেন, তখন ৫২৫ মেট্রিক টন মিয়ানমারের ইলিশ পশ্চিমবঙ্গের হিমাগারগুলোয় মজুদ ছিল।
বাংলাদেশে এখন আমদানি করা এই ইলিশের গায়ে লেখা নেই যে এগুলো কোন দেশের। তবে উৎস যাই হোক না কেন, ইলিশ আহরণে শীর্ষে থাকা বাংলাদেশে এখন যে আমদানি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন নেই।