Image description

টোকিও-লন্ডন-প্যারিস— তিন শহরের মধ্যে একটি মিল আছে। শহরগুলো ছিল পরিত্যক্ত হওয়ার পথে। সেগুলো আজ বিশ্বের প্রধান দর্শনীয় ও বাসযোগ্য নগরী। ঢাকাও কি সে পথেই? কারণ, চট্টগ্রামে ভর করে ঢাকার চাপ কমিয়ে বাসযোগ্য করার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ রয়েছে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়।

পাঁচ বছরের পরিকল্পনার বইগুলো ঢাউস সাইজের। এতে লেখা এন্তার উন্নয়নের রঙিন স্বপ্ন। এসব কাগুজে না রেখে কার্যকরের জন্য কাজ করতে হবে সরকারকে— এমনটাই বিশেষজ্ঞ মত। আর সরকারও বলছে— আমরা কাজ করার জন্যই এটা করেছি। লোকদেখানোর জন্য নয়।

খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় প্রথম এ ঘোষণা দেন তিনি। পরে ২০০৩ সালের ৬ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা বৈঠকে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। ওই পর্যন্তই। দুয়েকটি বড় স্থাপনা ছাড়া শহরটির উন্নয়ন হয়নি। এখনো প্রতি বর্ষায় ‘চুবা খায়’ দফায় দফায়। যদিও অমিত সম্ভাবনা এই চট্টগ্রামের। শহর কেন্দ্র করে পুরো জোনটাকে উন্নত করার জন্য সব উপকরণই হাতে আছে। প্রয়োজন শুধু সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। পরিকল্পনায় চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং একটি প্রধান কর্মসংস্থান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ চট্টগ্রামকে নিয়েই নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এসেছে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত। উন্নয়নের রাশ টেনে একদিকে যেমন ঢাকার ওপর চাপ কমানোর ছক আঁকা হচ্ছে, অন্যদিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক হাবে রূপান্তর করার ওপর। শুধু চট্টগ্রামই নয়, আগামী পাঁচ বছরের এ পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে পিছিয়ে থাকা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোও। উন্নয়নের নতুন যাত্রায় মূলধারার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে এগোবে হাওর, জলাভূমি এবং বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলও।

ঢাকায় মানুষ, গাড়ি আর কলকারখানার অতিরিক্ত চাপে জীবনযাত্রা অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে, অথচ সেই তুলনায় সবার জন্য সৃষ্টি হচ্ছে না ভালো কর্মসংস্থান। অন্যদিকে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের স্থায়ী বা বেশি আয়ের সুযোগ কম থাকায় পিছিয়েই থাকছে তারা। এ বৈষম্য দূর করতেই ঢাকার একক নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকাকেন্দ্রিক ‘অতিউন্নয়ন’ একদিকে বাড়িয়েছে ঢাকামুখী জনস্রোত, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে বৈষম্য। প্রতি বছর যোগ হচ্ছে পঁাচ লাখের বেশি মানুষ। কর্মসংস্থান থেকে নাগরিক সুযোগ সুবিধা— সবই যেন হয়েছে ঢাকার জন্য। ফলে বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় ওপরের দিকেই নাম থাকে এই শহরের। দীর্ঘদিন এ নিয়ে আলোচনা চললেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দীর্ঘ ভোগান্তির পর অবশেষে সরকারের টনক নড়েছে; ঢাকার একমুখী উন্নয়নে এবার টানা হচ্ছে লাগাম।

রাজধানীর শ্বাসরোধকারী চাপ কমাতে ড্যাপ (ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান)-এর আওতায় পূর্বাচল, ঝিলমিল, উত্তরা, সাভার, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জকে নিয়ে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও নতুন কর্মসংস্থানের ছক আঁকা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামকে সত্যিকার ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ করা এবং আঞ্চলিক শিল্পায়নে প্রাণ ফেরাতে ইপিজেড ও বিসিক শিল্পনগরীগুলোকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টেনে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘পাঁচসালা কৌশলগত পরিকল্পনায়’ (ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক) এসেছে এমন সিদ্ধান্ত।

সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়নের জটিলতা ও অতীত অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেছেন, ‘এটি নিশ্চয়ই একটি ভালো উদ্যোগ, তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে প্রতিটি সরকারই মুখে এমন কথা বললেও সরকারি বিনিয়োগের সিংহভাগটাই শেষ পর্যন্ত ঢাকায় গিয়ে জমা হয়। শুধু একটি মেট্রোরেল নির্মাণেই লাখ কোটি টাকা ঢালা হচ্ছে— অথচ এ বিশাল অঙ্কের অর্থ দিয়ে দেশের অন্য যেকোনো একটি আঞ্চলিক শহরকে পুরোপুরি বদলে দেওয়া সম্ভব ছিল।’

ঢাকামুখী উন্নয়ন ও দূরদর্শী পরিকল্পনার ঘাটতি তুলে ধরে তিনি আরও যোগ করেন, ‘পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নথিপত্রে যে সুদৃশ্য রূপরেখা আঁকা হয়েছে, তা যেন শুধু কাগজে-কলমেই আটকে না থাকে। আমরা এ পরিকল্পনার সত্যিকার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।’

ফ্রেমওয়ার্কে জিইডি বলছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় ৩৪ শতাংশ আসে শিল্প খাত থেকে। কিন্তু তার প্রায় পুরোটাই তৈরি হয়েছে ঢাকা আর চট্টগ্রাম ঘিরে। ঢাকার ওপর থেকে মানুষ, শিল্পকারখানা ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের অতিরিক্ত চাপ কমাতে এখন থেকে আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা শহরগুলোর উন্নয়নকে দেওয়া হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

এককেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, মূল বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধাগুলো মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। তৈরি পোশাক, নির্মাণ ও লজিস্টিকস খাতের সম্প্রসারণে প্রাথমিক পর্যায়ে এ ব্যবস্থা দ্রুত প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করলেও সময়ের ব্যবধানে তা রূপ নিয়েছে বড় প্রতিবন্ধকতায়। এর ফলে শহরগুলোতে তীব্র যানজট, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং নগর সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

এ সংকট থেকে উত্তরণে নতুন পরিকল্পনায় সুষম উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ড. মঞ্জুর আরও বলেছেন, আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে দেশের সব এলাকার জন্য সমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। সদ্য প্রণীত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এ বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে এর অর্থ ঢাকার গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া নয়, বরং চাপমুক্ত করে ঢাকাকেও একটি সুপরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কৌশল এতে রাখা হয়েছে।

ফ্রেমওয়ার্কে চট্টগ্রামকে প্রধান কর্মসংস্থান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জোর দেওয়া হয়েছে উত্তরাঞ্চলের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের ওপর। হাওর ও জলাভূমি অঞ্চলে পানিকেন্দ্রিক অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মৎস্য, হাঁস পালন, পর্যটন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে শক্তিশালী করা হবে। উপকূলীয় উন্নয়নে জলবায়ু অভিযোজন, নিরাপদ জীবিকা, বাঁধ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ব্লু-ইকোনমি, আধুনিক মৎস্য চাষ, এসএমই উন্নয়ন এবং একটি উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের নগর কর্মসূচির লক্ষ্য হলো বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা। এর প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে জোনিং, ভূমি-ব্যবহার ম্যাপিং, আধুনিক ও নিরাপদ শহর, ডিজিটাল পরিষেবা, টেকসই পরিবহন, সমন্বিত বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, ক্ষমতায়িত স্থানীয় সরকার এবং ডিজিটাল ভূমি সেবা নিশ্চিত করা। আবাসন নীতিতে পরিকল্পিত নগরায়ণ, স্বল্প আয়ের ও বস্তিবাসীদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, গৃহহীন জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং দুর্নীতি কমাতে একটি ল্যান্ড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ওপর মনোযোগ দেওয়া হবে।

রাজধানী ঢাকাকে মেগা-প্রকল্পের চাপ থেকে মুক্ত করে বাসযোগ্য করতে নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে আধুনিক সেবা খাতকে। যানজট কমাতে স্যাটেলাইট টাউন, রিং রোড ও বৃত্তাকার জলপথের পাশাপাশি মনোরেল, নারীদের আলাদা বাস এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্মার্ট ট্রাফিক নিশ্চিতে ‘মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট অথরিটি’ গঠন, সিসিটিভি সম্প্রসারণ ও শেয়ার্ড পার্কিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইকো-ট্যুরিজম, অনলাইন পোর্টাল ও ‘ঢাকা খাদ্য ও সংস্কৃতি উৎসব’-এর মাধ্যমে নগরীর ঐতিহ্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানো হবে।

ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন মানে সব জেলায় ঢালাও বিনিয়োগ নয়, বরং প্রান্তিক অঞ্চল ও শহরগুলোকে এক সুতায় গাঁথা। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ জানিয়েছে, দেশের বিদ্যমান একমুখী প্রবৃদ্ধি মডেলটি এখন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। ঢাকা-চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পায়ন এতদিন গতি দিলেও, এখন তীব্র যানজট, জমি ও আবাসনের চড়া দাম এবং পরিবেশের ক্ষতি সেই উৎপাদনশীলতাকে উল্টো থামিয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে দ্বিতীয় সারির শহর, সীমান্ত এলাকা, বন্দর ও গ্রামগুলোকে সরাসরি জাতীয় অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের তীব্র সংকটে পড়েছিল বিশ্বের তিন মেগাসিটি— টোকিও, লন্ডন ও প্যারিস। পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা এই তিন নগরীর উদাহরণ টেনে বলছিলেন— দূরদর্শী পরিকল্পনায় ঘুরে দাঁড়ায় নগরগুলো। ১৯৫০-এর দশকে ধোঁয়াশা ও ঘিঞ্জি পরিবেশ কাটাতে লন্ডন ‘গ্রিন বেল্ট’ ও ‘নিউ টাউন’ নীতির মাধ্যমে উপশহরে লোকসংখ্যা সরিয়ে নেয়। টোকিও সত্তরের দশকে ‘মেট্রোপলিটন প্ল্যান’-এর অধীনে শিনজুকুর মতো উপকেন্দ্র গড়ে মূল শহরের চাপ কমায়। অন্যদিকে, প্যারিস ১৯৬৫ সালের পরিকল্পনায় এক্সপ্রেস রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে পরিস্থিতি সামাল দেয়। বিকেন্দ্রীকরণ ও পরিকল্পিত অবকাঠামোই পরবর্তীকালে শহর তিনটি পুনরুজ্জীবনের মূল চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। ঢাকা নিয়েও আমরা আশাবাদী হতে চাই।