Image description

একাধিকবার উদ্বোধন হলেও রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নতুন ৫০০ শয্যার ভবনে এখনো পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি। বহির্বিভাগের কার্যক্রম শুরু হলেও রোগী ভর্তি, বড় ধরনের অস্ত্রোপচার ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সেবা মিলছে না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুতে প্রধান বাধা চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ প্রয়োজনীয় জনবল। ফলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি প্রস্তুত থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এদিকে পুরনো ৫০০ শয্যার ভবনটিতে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শয্যা সংকটের কারণে প্রতিদিনই রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে।

মানিকগঞ্জের শরিফুল হুদা চিকিৎসার জন্য বাবাকে হাসপাতালে আনলেও ভর্তি করাতে পারেননি। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ বহনও সম্ভব নয় তার পক্ষে। এ কারণে শয্যা খালি হওয়ার আশায় হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন।

শরিফুল হুদার মতো প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বহু রোগী এই হাসপাতালে আসেন। বিশেষ করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, দুর্ঘটনায় মাথা ও মেরুদণ্ডে আঘাত, ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় এই হাসপাতালের ওপর নির্ভর করেন রোগীরা।

দুই দফায় উদ্বোধন

রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে ১৫ তলা নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয় ২০১৮ সালে। ২০১৯ সালে কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক গ্রেপ্তার হওয়ায় প্রায় ২১ মাস কাজ বন্ধ ছিল। পরে ২০২১ সালে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ শুরু হয়।

২০২৪ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। অধিকাংশ যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভবনটি চালুর কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেটি চালু হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

এরপরও পূর্ণাঙ্গ সেবা শুরু করা যায়নি। সবশেষ চলতি বছরের ১৫ আগস্ট আবারও ভবনটি উদ্বোধন করেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর প্রায় দুই সপ্তাহ পর ৩১ আগস্ট সেখানে বহির্বিভাগের কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়।

নতুন ভবনে কী আছে

আধুনিক চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের জন্য বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে নতুন ভবনে। ওয়ার্ডের পাশাপাশি রয়েছে ১১২টি কেবিন, ৪০টি আইসিইউ বেড ও ২৪টি পোস্ট-অপারেটিভ বেড। ১০০ শয্যার বিশেষায়িত ট্রমা ইউনিটও রয়েছে। সেখানে ২৪ ঘণ্টা অস্ত্রোপচারের সুবিধা আছে।

এছাড়া ২০ শয্যার নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (এইচডিইউ), ৬২টি ভেন্টিলেটর (কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র) সুবিধা, একটি ক্যাথল্যাব, দুটি এমআরই ও দুটি সিটি স্ক্যান মেশিন রয়েছে। অত্যাধুনিক অটোক্লেভ মেশিন, চিকিৎসা বর্জ্য অপসারণে সলিড ওয়েস্ট ডিসপোজাল সিস্টেম ও পৃথক অক্সিজেন প্ল্যান্টের ব্যবস্থাও রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন ভবনে রেডিওলজি বিভাগে সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও এক্স-রে সেবা চালু রয়েছে। নতুন ক্যাথল্যাব ও একাডেমিক কার্যক্রমও স্বল্প পরিসরে শুরু হয়েছে। তবে নতুন ভবনে এখনো রোগী ভর্তি রাখা শুরু হয়নি। জটিল রোগের অস্ত্রোপচার ও আইসিইউ সেবাও চালু হয়নি।

কেন চালু হচ্ছে না

হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নুরুজ্জামান খান বলেন, ‘আমাদের ডাক্তার ও নার্সের স্বল্পতা আছে। এখানে যারা কাজ করেন তারা নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিনের। সারা দেশেই বিশেষজ্ঞ নিউরোলজিস্ট ও নিউরোসার্জনের স্বল্পতা আছে। এ কারণে আমাদের ডাক্তার পেতে সময় লাগছে। নতুন ভবনের ওটি, আইসিইউ ও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড কবে থেকে চালু করা সম্ভব হবে তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চালু হবে বলে আশা করছি।’

২০১২ সালে ৩০০ শয্যা নিয়ে যাত্রা করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। পরে প্রথম ভবনে শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০ করা হয়। স্নায়ুরোগের চিকিৎসায় দেশের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় প্রতিদিনই সেখানে রোগীর চাপ বাড়ছে।

হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবলের ব্যবস্থা করে নতুন ভবনের পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করা হবে।