শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কারের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের এক প্রকৌশলীর অফিসকক্ষে নগদ টাকা লেনদেনের একটি ভিডিও ফাঁস হওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভিডিওটি আরও আগের। তবে, ফাঁস হয়েছে গত সপ্তায়। যা নিয়ে তোলপাড় চলছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অফিসের চেয়ারে বসে আছেন তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকত। তাঁর সামনের টেবিল ঘিরে কয়েকজন ব্যক্তি বসে ও দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের কয়েকজন বড় খাম থেকে এক হাজার ও পাঁচশ টাকার নোটের বান্ডেল বের করে টেবিলের ওপর রাখছেন। একপর্যায়ে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যারের কাছে ৫ লাখ টাকা রেখে যান।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ ও ঠিকাদারি কাজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী বলয়ের কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল এই অর্থ লেনদেন। তবে এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকত। তাঁর দাবি, ওই অর্থ তাঁর নয় এবং দুই ঠিকাদারের পারস্পরিক সমঝোতার অংশ হিসেবে তাঁর অফিসে টাকা হস্তান্তর করা হয়েছিল।
তিনি শুধু সাক্ষী ছিলেন।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি দাবি করেছেন, ভিডিওটি ২০২২ সালের ২৬ মে ধারণ করা হয়েছিল। সে সময় মো. হাসান শওকত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। তিনি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হন।
ভিডিওতে কী ঘটেছিল, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঠিকাদারি কাজের অবৈধ সুবিধা ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের অংশ হিসেবে প্রকৌশলীর উপস্থিতিতে নগদ টাকা লেনদেন করা হয়েছিল। অন্যদিকে ভিডিওতে উপস্থিত প্রকৌশলী (বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মো. হাসান শওকত বলছেন, একটি নির্মাণকাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার চুক্তির অংশ হিসেবে পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছিল।
কিন্তু সরকারি অফিসে দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার সামনে বসে এভাবে টাকার লেনদেন-ভাগবাটোয়ারা করাটা আইনতঃ কি বৈধ, এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি প্রকৌশলী শওকত হাসানের কাছ থেকে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা সরকারি কর্মচারী আচরণ ও শৃঙ্খলা বিধির গুরুতর লঙ্ঘন। তাই এ বিষয়ে যথাযথ তদন্তের দাবি করেছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত তদন্তের কোনো রকমের উদ্যোগ নেয়নি।
ভিডিওতে যা দেখা যাচ্ছে
হাতে আসা ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, একটি অফিসকক্ষে মো. হাসান শওকত বসে আছেন। তাঁর সামনে কয়েকজন ব্যক্তি অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের হাতে বড় খাম। খাম খুলে নগদ টাকার বান্ডেল টেবিলে রাখা হচ্ছে।
ভিডিওর একপর্যায়ে পারফরম্যান্স গ্যারান্টির মেয়াদ এবং অর্থ ফেরত দেওয়া নিয়ে কথাবার্তা শোনা যায়। একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘পিজির মেয়াদ কবে... পিজির মেয়াদের জন্য স্যারের কাছে ৫ লাখ টাকা রেখে যান। পিজির মেয়াদ বের করে দেবেন... স্যারের কাছ থেকে নিয়ে যাবেন। ’
ভিডিওটি কোথায় ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষেই এটি ধারণ করা হয়েছিল।
প্রশ্ন উঠেছে, দুই বেসরকারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক আর্থিক সমঝোতা হলেও সেটি কেন একজন সরকারি কর্মকর্তার অফিসকক্ষে এবং তাঁর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হবে? সরকারি কর্মকর্তার অফিসকে ব্যক্তিগত বা বেসরকারি আর্থিক লেনদেনের সাক্ষী হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ বা যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
যে নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে লেনদেন
ভিডিওতে উপস্থিত দুই পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটির সূত্রপাত একটি সরকারি কলেজ ভবন নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে। দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার কাজ পায় ঢালী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটে পড়ে এবং নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে কাজের অবশিষ্ট অংশ সম্পন্ন করার বিষয়ে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে মিরন এন্টারপ্রাইজ আগ্রহ দেখায়।
কাজ পাওয়ার সময় ঢালী কনস্ট্রাকশন যে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দিয়েছিল, সেটি ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। নির্মাণকাজের মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা হওয়ায় পাঁচ শতাংশ পারফরম্যান্স গ্যারান্টির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা।
মিরন এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব হোসেন মিরনের দাবি, পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ভিডিওতে দেখা যাওয়া অর্থ হস্তান্তর হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘ঢালী কনস্ট্রাকশন কাজ করতে পারছিল না। তখন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে আমাদের বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হয়। কাজের লাভ খুব বেশি ছিল না। তারপরও কর্মকর্তাদের অনুরোধে আমরা অবশিষ্ট কাজ শেষ করার দায়িত্ব নিই। এ জন্য একটি লিখিত চুক্তি হয়েছিল। ’
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঢালী কনস্ট্রাকশন তাদের পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা ফেরত পেতে চেয়েছিল। প্রায় ২৪ লাখ টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা চুক্তির দিন তাদের হাতে দেওয়া হয়েছিল।
ঢালী কনস্ট্রাকশনের বক্তব্য
ভিডিওতে টাকা গ্রহণকারী হিসেবে যাঁকে দেখা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তিনি ঢালী কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা ওই টাকা পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম না। মিরন সে সময় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিলেন। তাই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সামনে টাকা হস্তান্তর করা হয়েছিল, যাতে বিষয়টি সাক্ষীর উপস্থিতিতে হয়। ’ তাঁর দাবি, মো. হাসান শওকত ওই টাকা থেকে কোনো অর্থ নেননি।
ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে কাজ হস্তান্তরের বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। তারাই একজন আরেকজনকে পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা দিয়েছেন। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে প্রকৌশলী ঘুষ নিয়েছেন। এটি সঠিক নয়। ’
প্রকৌশলীর দাবি- তিনি টাকা নেননি
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে মো. হাসান শওকত ভিডিওতে তাঁর উপস্থিতির কথা অস্বীকার করেননি। তবে তিনি বলেন, ‘একটি কাজের বিষয়ে দুই ঠিকাদার আমার রুমে সমঝোতা করেছিলেন। টাকাগুলো ওই ঠিকাদারদের। এর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ’ তিনি দাবি করেন, তাঁর সামনে দুই পক্ষ পারস্পরিক আর্থিক লেনদেন করেছে। তিনি কোনো টাকা নেননি।
মো. হাসান শওকত বলেন, ‘দুই পক্ষ চুক্তি করেছে, কাজ হস্তান্তর হয়েছে। তারাই একজন আরেকজনকে পিজির টাকা দিয়েছে। কিন্তু বলা হচ্ছে, আমি ঘুষ নিয়েছি। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তাদের কাছ থেকে আমি এক পয়সাও নিইনি। ’
সরকারি অফিসে এ ধরনের চুক্তি বা আর্থিক লেনদেনের সাক্ষী থাকা আইনসম্মত কি না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই তৃতীয় পক্ষ কোনো কাজ শেষ করে। তাঁর জানা মতে, এতে আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে এ প্রশ্ন থেকেই যায়- দুই ঠিকাদারের পারস্পরিক আর্থিক চুক্তি সম্পাদনের জন্য সরকারি প্রকৌশলীর অফিস ব্যবহার করা কতটা সঙ্গত ছিল এবং একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে নগদ অর্থ লেনদেনের প্রয়োজনই বা কেন হয়েছিল।
‘৫ লাখ টাকা রেখে যান’- কার কাছে?
ভিডিওটির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হচ্ছে ৫ লাখ টাকা নিয়ে বক্তব্য। একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যারের কাছে ৫ লাখ টাকা রেখে যান। ’ এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
যদি অর্থগুলো দুই ঠিকাদারের পারস্পরিক লেনদেনের অংশ হয়, তাহলে ‘স্যারের কাছে’ টাকা রাখার প্রয়োজন কেন- এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বলছে, পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতেই এমন কথাবার্তা হয়েছিল। তবে ভিডিওতে সরকারি কর্মকর্তার টেবিলে নগদ অর্থের বান্ডেল রাখা এবং তাঁর উপস্থিতিতে অর্থের হিসাব-নিকাশ হওয়াকে প্রশাসনিকভাবে অস্বাভাবিক বলছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের মতে, সরকারি অফিসে নগদ অর্থের লেনদেনের ঘটনা নিজেই প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে যখন সেই কর্মকর্তা ঠিকাদারি কাজের অনুমোদন, বিল, কাজের অগ্রগতি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকেন। তাছাড়া প্রকৌশলী হাসান শওকতের বিরুদ্ধে আরও বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভূমিকা
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব পালন করে। নতুন ভবন নির্মাণ, পুরোনো ভবনের সংস্কার, সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সুবিধা স্থাপনেও অধিদপ্তর কাজ করে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীদের হাতে বিপুল পরিমাণ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে। দরপত্র আহ্বান, কাজের মূল্যায়ন, ঠিকাদার নির্বাচন, নির্মাণ তদারকি এবং বিল পরিশোধের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কোনো আর্থিক লেনদেন সরকারি কর্মকর্তার অফিসে সংঘটিত হলে তা নিশ্চিতভাবে ঘুষ লেনদেনের কথাই এসে যায়।
তদন্তের দাবি
ভিডিওটি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের প্রকল্পের নথি, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব, পারফরম্যান্স গ্যারান্টি, কাজ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া, কাজের বাস্তবায়ন এবং সরকারি অনুমোদনের কাগজপত্রও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একটি সরকারি অফিসে নগদ অর্থের বান্ডিল কেন এল, কার টাকা কার কাছে গেল এবং সরকারি কর্মকর্তা সেখানে কী ভূমিকায় ছিলেনÑএই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট জবাব না পাওয়া পর্যন্ত বিতর্ক কাটবে না। ভিডিওটিকে কেন্দ্র করে এখন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আরও কিছু প্রকল্প, বিল পরিশোধ এবং দরপত্র মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মো. হাসান শওকতের দায়িত্বকালীন সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজের অগ্রগতি ও বিল পরিশোধের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভিডিও’র তদন্ত হয় কি না এবং তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
শীর্ষনিউজ