প্রতিযোগিতা ছাড়াই পেয়েছেন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করেছেন ইচ্ছামতো। কর ছাড়, ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ (রেন্টাল ভাড়া), প্রকল্পের জমি, ঋণগ্রহণে সহযোগিতাসহ সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিলেও বিদ্যুৎ সংকটে পাশে থাকেন না বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আইপিপি) মালিকরা। বরং সংকটকে পুঁজি করে বকেয়া বিল আদায়ে চাপসহ আরও বাড়তি সুবিধা আদায়ের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই। যার ব্যতিক্রম হয়নি বর্তমান সরকারের আমলেও। গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশ জুড়ে চলছে রেকর্ড লোডশেডিং। পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা চাপ দিতে থাকেন বকেয়া আদায়ে। বকেয়া পরিশোধ না করলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়— দেওয়া হয় এমন ঘোষণাও। অন্যদিকে ভ্যাপসা গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ে হাহাকার ঘরে ঘরে। কারখানায় থেমে থেমে চলছে উৎপাদনের চাকা। ক্ষতি হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের। এতে সরকারের ওপর তৈরি হচ্ছে চাপ। এমন প্রেক্ষাপটে অনেকটা বাধ্য হয়েই ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় দিয়েছে অর্থ বিভাগ, যা খরচ করা হবে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের দেনা শোধে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, বর্তমানে বিভিন্ন কেন্দ্রের বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক মালিকদের ৫ হাজার কোটি টাকার মতো। অর্থ বিভাগ থেকে অর্থ ছাড় পাওয়ায় পুরো বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বকেয়া পরিশোধের পর চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে হবে মালিকদের। এরপরই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়াও পরিশোধ করা হবে।
পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গড়ে দুই-আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেও তা বাড়িয়ে অন্তত পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের পরিকল্পনা রয়েছে। সবচেয়ে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ২৫ টাকা। এতে পিডিবির ইউনিটপ্রতি লোকসান হবে ১৬ টাকার মতো।
বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বৃদ্ধি সংকট মোকাবিলার সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে, স্থায়ী সমাধান নয়। দীর্ঘ সময় তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো হলে পিডিবির লোকসান অনেক বাড়বে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সংকটকে মুনাফা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে যুগ যুগ ধরে ব্যবহার করে আসছেন। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও বেশি। কখনো কখনো পরোক্ষভাবে সংকট তৈরি করেন তারা। তারা এতই শক্তিশালী যে, দেশের জ্বালানি খাত থেকে শুরু করে রাজনীতি, সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন। অযৌক্তিক ও অন্যায়ভাবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরির পাশাপাশি সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছেন। অল্প সময়ে অতি মুনাফা করেছেন। আগের সেই ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।’
‘জ্বালানি খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা অকার্যকর হলে এ খাতের ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করবেন। সেটাই হচ্ছে। এখানে ভোক্তার স্বার্থ উপেক্ষিত’— যোগ করলেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
বর্তমানে প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে বেসরকারি খাতে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য বাড়তে থাকে। দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিত বিশেষ বিধানের আওতায় প্রতিযোগিতা ছাড়াই বেসরকারি খাতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। নিজেদের মতো করে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করেন উদ্যোক্তারা। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে পিডিবির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকি বেড়েছে। সেই চাপ সামলাতে গিয়ে দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগ মালিক আওয়ামী লীগ সরকার-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি।
তিন-পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যয়বহুল ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর চুক্তির মেয়াদ একাধিকবার বাড়িয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, ফার্নিচার ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে এ খাতে অভিজ্ঞতা নেই, এমন অনেকেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক হয়েছেন। বিদেশ থেকে পুরনো যন্ত্রপাতি এনে এসব কেন্দ্র নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব কেন্দ্র সক্ষমতার ২৫-৩০ শতাংশ, কখনো কখনো তারও কম সময় চালানো হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র না চললেও নিয়মিত বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পাচ্ছেন তারা। অবস্থা এমন যে, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেই তাদের লাভ বেশি।
পরে দীর্ঘমেয়াদি আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ পেয়েছেন ঘুরেফিরে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ী।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও ছয়-সাত মাসের বকেয়া ছিল। কিন্তু তখন এসব ব্যবসায়ী চাপ দিলেও এখানকার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। তবে এই সুযোগকে পুঁজি করে সরকারের কাছ থেকে আরও বাড়তি সুবিধা আদায় করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বকেয়ার চাপ বাড়তে থাকে। তখন সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার বন্ড ছেড়ে বকেয়া সমন্বয় করেছিল। পাশাপাশি নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে। তাই গত বছর গ্রীষ্ম মৌসুমে এত লোডশেডিং হয়নি। সংকট সামলাতে বর্তমান সরকারের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় বেশ আগেই। তবে বকেয়া বিল পরিশোধ না হলে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয় বলে জানান কেন্দ্রমালিকরা। তাদের দাবি, পাওনা পরিশোধ করা হলে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে আরও প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব।
বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী, চাহিদামতো বিদ্যুৎ দিতে না পারলে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে একটি নির্দিষ্ট হারে জরিমানার বিধান রয়েছে। পিডিবি এই জরিমানা করলেও তা ঠিকমতো আদায় হয় না। এর আগে বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকরা দফায় দফায় এসব জরিমানা স্থগিত করার সময় বাড়িয়েছেন। মূলত যখনই সংকট শুরু হয়, তখনই নানা বাহানায় এসব সুবিধা আদায় করেন বলে অভিযোগ।
বিদ্যুৎ খাতে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য থাকলে তারা এ খাতে সর্বনাশ ডেকে আনবে বলে মনে করেন পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ। আগামীর সময়কে বললেন, ‘তারা নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করবেন— এমন আশঙ্কা থেকে শুরুতেই আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার কথা শোনেনি। এখন সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। এসব ব্যবসায়ীরা ব্ল্যাকমেইল করে নানা কৌশলে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন। কিন্তু সংকটে পাশে থাকছেন না। তারা মহাশক্তিশালী।’