Image description

চট্টগ্রাম নগরীতে ৭০ লাখ বাসিন্দা। তাদের তৃষ্ণা মেটে ওয়াসা, নলকূপ ও বাণিজ্যিক জারের পানিতে। জীবন বাঁচানোর জন্য এসব উৎসের ওপর ভরসা করলেও তা মোটেও নিরাপদ নয় বলে জানা গেল এক গবেষণা প্রতিবেদনে। এমনকি এই শহরের তিন উৎসের পানির মান নিয়েই উদ্বেগ রয়েছে খোদ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ)। সংস্থাটির খসড়া মহাপরিকল্পনায় তুলে ধরা হয়েছে এ বিষয়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক ওই গবেষণার উদ্বেগজনক তথ্য। যেখানে মিলেছে প্রতি ফোঁটা পানিতে প্রায় ৭০০ ব্যাকটেরিয়া পাওয়ার প্রমাণ।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, বাসাবাড়িতে ২০-৩০ মিনিট ধরে ফোটানো বা ফিল্টারে শোধন করার পরও প্রতি ফোঁটা পানিতে থেকে যাচ্ছে ক্ষতিকর প্রায় ৫০০ উপাদান। এমনকি শোধনের পর পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্র কণার পরিমাণ কমার বদলে উল্টো বেড়ে যাওয়ার প্রমাণও পেয়েছেন গবেষকরা।

ছয়টি শোধনাগার ও ৪৬টি নলকূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৮ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। কিন্তু এর গুণগত মান নিয়ে এবার সিডিএ প্রণীত মহানগরীর খসড়া মহাপরিকল্পনায়ও প্রকাশ করা হয়েছে গভীর উদ্বেগ। গত ২ আগস্ট প্রকাশিত খসড়ায় ‘স্ট্রাকচার প্ল্যান’ অংশে সুপেয় পানির মান নিয়ে রাখা হয়েছে একটি বিশেষ অধ্যায়। সেখানে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘হেলিওন’-এ প্রকাশিত একটি যৌথ গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের সব উৎসের পানিতেই অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত জীবাণুর উপস্থিতি।

মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি), চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম মালয়েশিয়ার পাঁচ গবেষক। তারা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কোতোয়ালি, হালিশহর, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, বন্দর ও সরাইপাড়া এলাকা থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত পানির ৩৬টি নমুনা পরীক্ষা করেন ল্যাবরেটরিতে। পাশাপাশি মান নিয়ে মতামত জানতে নেওয়া হয় ১৪৯ বাসিন্দার মতামত।

গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার রিসার্চের গবেষক ও চবি অধ্যাপক ড. শ্যামল কর্মকার বলেছেন, ‘গবেষণায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়া ও রাসায়নিকের উপস্থিতি দেশেই পরীক্ষা করা সম্ভব। এর বাইরেও মিলেছে অসংখ্য অজানা অজৈব দূষক। যা হয়তো শনাক্তই করতে পারছি না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র বৈজ্ঞানিক ও টেকসই সমাধান হলো— বাসাবাড়ির পাশের নালা থেকে শুরু করে ভূগর্ভ ও ভূপৃষ্ঠের পানির উৎসগুলোকে দূষণমুক্ত করা। নয়তো পানিচক্রের মাধ্যমে এই দূষিত পানি আবার প্রবেশ করবে আমাদের শরীরে।’

অকার্যকর ফিল্টারফুটানো পানিতেও দূষণপরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, সুপেয় বা পানের পানিতে ক্ষতিকর উপাদান বা ব্যাকটেরিয়ার  উপস্থিতি ‘শূন্য’ থাকতে হবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ওয়াসার অপরিশোধিত পানিতে এলাকাভেদে প্রতি মিলিলিটারে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে ৯ হাজার ২৫০ থেকে ১৪ হাজার পর্যন্ত। বাসাবাড়িতে শোধন করার পরও থেকে যাচ্ছে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ১০ হাজার ৩০০ পর্যন্ত।

একইভাবে নলকূপের পানিতে অপরিশোধিত অবস্থায় ৬৮০ থেকে ১৩ হাজার ৫০০ এবং শোধনের পর ৬৮০ থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। জারের পানিতে অপরিশোধিত অবস্থায় ১৫০ থেকে ১ হাজার এবং শোধনের পর ১০০ থেকে ৬৫০টি ব্যাকটেরিয়া মিলেছে।

প্রতি ফোঁটা পানিতে ৭০০ ব্যাকটেরিয়া: গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মিলিলিটার পানিতে যে পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া মিলেছে, তা এক ফোঁটা পানির হিসাবে আনলে চিত্রটি আরও ভয়াবহ। সাধারণত এক মিলিলিটার পানিতে প্রায় ২০ ফোঁটা ধরা হয়। অর্থাৎ এক ফোঁটা পানির পরিমাণ প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ৫ মিলিলিটার। এই হিসাবে চান্দগাঁও এলাকার ওয়াসার অপরিশোধিত পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ১৪ হাজার ব্যাকটেরিয়া মিলেছে। অর্থাৎ এক ফোঁটায় থাকছে ৭০০। বন্দর এলাকার নলকূপের অপরিশোধিত পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ১৩ হাজার ৫০০ ক্ষতিকারক উপাদান। এক ফোঁটা পানিতেই থাকছে প্রায় ৬৭৫। শোধনের পরও সেই পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ১০ হাজার ব্যাকটেরিয়া থেকে যাওয়ায় প্রতি ফোঁটায় দূষণের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০০টি। একইভাবে কোতোয়ালি এলাকার ওয়াসার অপরিশোধিত পানিতে প্রতি ফোঁটায় মেলে প্রায় ৫০০টি ব্যাকটেরিয়া। শোধনের পর কিছুটা কমে নামে ৪০০টিতে।

শোধনের পর উল্টো বাড়ছে ভাসমান কণাপরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, খাবার পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্র কণার (এসএস বা টিএসএস) গ্রহণযোগ্য সীমা প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ১০ মিলিগ্রাম। কিন্তু ওয়াসা ও নলকূপের পানিতে তা ৪০ থেকে ১ হাজার ৮৮৮ মিলিগ্রাম। কোতোয়ালি এলাকার ওয়াসার পানি ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে বাসাবাড়িতে শোধন করার পর আরও বেড়ে গেছে ভাসমান কণার পরিমাণ।

গবেষকদের ধারণা, বাসাবাড়ির ফিল্টারগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করা বা ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার কারণে এই চিত্র। একই বিধিমালা অনুযায়ী, পানিতে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের (টিডিএস) আদর্শ মান প্রতি লিটারে ১ হাজার মিলিগ্রাম। কিন্তু বন্দর ও হালিশহর এলাকার নলকূপের পানিতে তা বেশি পাওয়া গেছে।

পানের অযোগ্য বলছেন ৭৬ শতাংশ গ্রাহক: জরিপে অংশ নেওয়া ওয়াসার পানি ব্যবহারকারীদের ৭৬ শতাংশই বলেছেন, এই পানি পানের অনুপযোগী। তাদের মূল অভিযোগ দুর্গন্ধ (৫৬ শতাংশ) এবং ভাসমান কণার উপস্থিতি (১৭ শতাংশ)। অন্যদিকে নলকূপ ব্যবহারকারীদের ৫৮ শতাংশ পানিতে অস্বাভাবিক বাদামি রঙের কথা জানিয়েছেন। শোধন করে পান করার পরও ওয়াসার গ্রাহকদের ১১ শতাংশ এবং নলকূপের গ্রাহকদের ৯ শতাংশ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া উভয়ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ মানুষ জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশিই শিশু।

যেভাবে দূষিত হচ্ছে পানিগবেষকরা বলছেন, কর্ণফুলী ও হালদা নদী থেকে পানি শোধনের পর সরবরাহ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। কিন্তু পাইপলাইনের ফুটো এবং ড্রেনেজ অব্যবস্থাপনার কারণে গ্রাহকপর্যায়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দূষিত হয়ে পড়ছে সেই পানি। অন্যদিকে অনিবন্ধিত কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জারের পানি প্রক্রিয়াজাত করায় সেখানেও থেকে যাচ্ছে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি।

তবে দূষণের দায় নিতে নারাজ চট্টগ্রাম ওয়াসা। সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেছেন, ‘চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারব, ওয়াসার পানিতে কোনো ব্যাকটেরিয়া নেই। প্রতি মাসে ২৪০টি স্পট থেকে পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়, যেখানে পাওয়া যায় না দূষণের অস্তিত্ব। মূলত গ্রাহকপর্যায়ে গিয়ে পানি দূষিত হচ্ছে। কারণ, সচেতনতা কর্মসূচি চালানোর পরও পানির রিজার্ভার ও ট্যাংক পরিষ্কার রাখে না মানুষ। ঘরের পানির জগ যেমন পরিষ্কার রাখা হয়, তেমনি পানি জীবাণুমুক্ত রাখতে হলে পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে রিজার্ভার ও ট্যাংক। এ ছাড়া অনেক সংস্থা উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে পাইপ ফাটিয়ে ফেলে। তখন ময়লা পানি ঢুকে দূষণ হতে পারে। তবে আমরা খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা মেরামত করে ফেলি।’