Image description

একটি ঘর। চারপাশ বন্ধ। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানে মানুষের কান্না শোনা যেত না। চিৎকারও না। কারণ, কক্ষগুলো ছিল সাউন্ডপ্রুফ। নির্যাতনের সময় বাইরে উচ্চস্বরে গান বাজানো হতো। যেন ভেতরের আর্তনাদ কোনোভাবেই বাইরে পৌঁছাতে না পারে। চোখ বাঁধা। হাতে হাতকড়া। কখনো পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা। কখনো শরীরে বৈদ্যুতিক শক। নখের নিচে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো পিন। চলত বেধড়ক মারধর। জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলত নির্মম নির্যাতন। এমনই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের কাছে তুলে ধরেছেন আয়নাঘরের বন্দিশালার ভুক্তভোগীরা।

২৯ বছর বয়সী এ রকমই একজন ভুক্তভোগী যুবক, যিনি ২০১০ সালে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৫-এর সদস্যদের হাতে গুম হওয়ার পর প্রায় ৪৬ দিন নিখোঁজ ছিলেন। ওই যুবক গুম কমিশনের কাছে নিজের ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘আয়নাঘরে চার-পাঁচজন তাকে মারধর করে একটি হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিত। কাপড় খুলে শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গে লাগানো হতো বৈদ্যুতিক ক্লিপ। সুইচ চাপলেই শরীর কেঁপে উঠত। অসহ্য যন্ত্রণায় মনে হতো অঙ্গগুলো পুড়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে গোশত পুড়লে যেমন গন্ধ হয়, সেই গন্ধ পেতাম।’

বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার নির্মম অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ওই যুবক আরও জানিয়েছেন, ‘শক দিলে মনে হতো, পুরো শরীরটা ফুটবলের মতো গোল হয়ে যাচ্ছে। একবার নয়। আট-দশবার তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি চলে বেধড়ক মারধর। পা থেকে গলা পর্যন্ত শরীরের কোনো অংশ বাদ যায়নি তার। িনর্যাতনে তার পুরো শরীর কালো হয়ে গিয়েছিল।’

এভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে গোপন বন্দিশালার টর্চার সেলে আটকে রাখা ব্যক্তিদের ওপর চলত নির্যাতন। ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, গোপন বন্দিশালার নির্যাতন কক্ষগুলো বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল। অধিকাংশ কক্ষ ছিল সাউন্ডপ্রুফ। নির্যাতনের সময় উচ্চস্বরে গান বাজানো হতো। উদ্দেশ্য একটাই— ভেতরের কোনো শব্দ যেন বাইরে না যায়। শুধু নির্যাতনই নয়, বন্দিদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও ছিল না। টয়লেট ব্যবহারের সময়ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের ওপর নজর রাখা হতো। কোনো কোনো সেল এতটাই ছোট ছিল, সেখানে শোয়ার জায়গা ও টয়লেটের মধ্যে কার্যত কোনো ব্যবধান ছিল না।

আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে গুমের এমন অভিযোগ ছিল বিস্তর। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশনের তদন্তে উঠে আসে ভয়াবহ চিত্র। প্রমাণ ধ্বংসের চেষ্টা করা হলেও পরিদর্শনকালে তখন দেশের প্রায় প্রতিটি আটককেন্দ্রে বিশেষ জেরা কক্ষ ও নির্যাতনের সরঞ্জামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

গুম কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পরিদর্শন করা প্রায় প্রতিটি আটককেন্দ্রেই নির্যাতনের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত জেরা কক্ষ ছিল। কোথাও পাওয়া গেছে ঘূর্ণায়মান চেয়ার। কোথাও যম টুপি। কোথাও মানুষকে ঝুলিয়ে নির্যাতনের জন্য ছিল ‘পুলি সিস্টেম’।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, র‌্যাব-২-এ পাওয়া গেছে ঘূর্ণায়মান চেয়ার। র‌্যাব-৪ ও ডিবিতে পাওয়া গেছে ‘যম টুপি’। টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে পাওয়া গেছে মানুষকে ঝুলিয়ে নির্যাতনের যন্ত্র। ধ্বংস করা হয়েছে— এমন অনেক স্থানেও সাউন্ডপ্রুফিংয়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, চিৎকার যাতে দেয়াল পেরিয়ে বাইরে না যায়, তারও ব্যবস্থা ছিল। তবে সারা দেশে মোট কতটি এমন গোপন বন্দিশালা ছিল, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি।

২২ কক্ষের গোপন বন্দিশালা: সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ডিজিএফআই সদর দপ্তরের একটি দোতলা ভবনে ২২টি কক্ষে গোপন বন্দিশালা পরিচালিত হতো। বগুড়ায় পুলিশ লাইনসের ভেতরেও কারাগারের আদলে গোপন বন্দিশালা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার উত্তরায় বিমানবন্দর এলাকায় র‌্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের ভেতরে অস্ত্রাগারসংলগ্ন পুরনো একটি দোতলা ভবনে ছিল টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন বা টিএফআই সেল। সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এটি বলপূর্বক গুমের অন্যতম প্রধান বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ভবনের নিচতলায় ছিল ১০টি সেল। প্রতিটির গড় আয়তন প্রায় ৫ ফুট বাই ৮ ফুট। ছিল খোলা টয়লেট। একই তলায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা র‌্যাব সদস্যদের থাকার জায়গাও ছিল। দ্বিতীয় তলায় ছিল আরও ১০টি সেল। এগুলোর গড় আয়তন প্রায় ১৪ ফুট বাই ৪-৫ ফুট। এর মধ্যে দুটি বড় সেলকে বলা হতো ‘ভিআইপি সেল’। আর প্রবেশমুখের সিঁড়ির কাছে ছিল আরও সাতটি অতি ছোট সেল। প্রতিটির আয়তন আনুমানিক ২ ফুট বাই ৪ ফুট। এগুলো পরিচিত ছিল ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’ নামে।

টয়লেটেও ছিল ক্যামেরা: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব সেলের অধিকাংশই ছিল অত্যন্ত ছোট ও সংকীর্ণ। প্রস্রাব-পায়খানার জন্য কোনো কোনো সেলে প্যানের সঙ্গে আলাদা দেয়ালও ছিল না। ফলে বন্দিরা শুয়ে থাকলে শরীর প্রায়ই প্যানের ওপর পড়ে থাকত। ময়লা, প্রস্রাব ও মলের মধ্যে কাটাতে হতো দীর্ঘ সময়। তার ওপর ছিল সিসিটিভি ক্যামেরা। টয়লেট ব্যবহারের সময়ও নজরদারি থেকে মুক্তি ছিল না। ফলে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি বন্দিদের চরম অপমান ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যেও রাখা হতো।

ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের ওপর অন্তত ১০ ধরনের শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। শরীরে ক্ষত তৈরি হলে কখনো ওষুধ বা মলম দেওয়া হতো। ক্ষত কিছুটা সেরে গেলে তাদের জনসমক্ষে আসামি হিসেবে হাজির করা হতো।

স্থান ও আলামত সংরক্ষণের দাবি: হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক এজাজুল ইসলাম বললেন, যেসব স্থানে গোপন আটক, নির্যাতন বা গুমের ঘটনা ঘটেছে, তদন্তে উঠে আসা সেসব স্থান ও আলামত সংরক্ষণ করা জরুরি।

তার মতে, গুমের বিচার কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, আইনের শাসন ও মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন। অতীতের গুমের বিচার না হলে ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন এমন শক্তিশালী আইন ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে কোনো নাগরিককে ভবিষ্যতে অদৃশ্য করে দেওয়া সম্ভব না হয়।

প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেছেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই গুমের অবসান হবে না। প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত করতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে অতীতের ঘটনার সত্য উদ্‌ঘাটন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে গুমের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।