Image description

ঢাকার মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় সরকারের কাছ থেকে কম ভাড়ায় পাওয়া ফ্ল্যাটটি জয় বিশ্বাসের জীবনে নতুন শুরুর কথা ছিল। কিন্তু তিনি সেই স্বপ্ন ছেড়ে আবার নিজের বেড়ে ওঠা বস্তিতেই ফিরে গেছেন। ভাড়ার বাইরের বাড়তি খরচ হিসাব করে বাবার ব্যবসা সামলাতে পুরোনো ঘরেই ফেরার সিদ্ধান্ত নেন জয়।

ফ্ল্যাটের ভালো পরিবেশ ছেড়ে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, খরচের হিসাবই তার কাছে আসল কথা, আয় ভালো হলে কেউ বস্তিতে থাকত না।

জয়ের এই ঘটনা বাংলাদেশের শহরের আবাসন ব্যবস্থার একটি বড় ভুল ধরিয়ে দেয়। আয় না বাড়লে কম আয়ের মানুষকে সুন্দর ফ্ল্যাটে এনে রাখা কোনো কাজে আসে না।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২১ সালের আগস্টে বস্তিবাসীদের জন্য ভাড়ায় ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া শুরু করে। মিরপুর ১১-এর কালশীতে ছয় বিঘা জমিতে ১৪ তলার পাঁচটি ভবন বানানো হয়। ৬২০ থেকে ৭১৯ বর্গফুটের প্রতি ইউনিটে দুটি শোয়ার ঘর, একটি বারান্দা, বসার ঘর ও শৌচাগার রয়েছে।

প্রতি মাসে সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়া কম মনে হলেও, অন্যান্য খরচ মিলে তা অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়। তাই অনেকেই ফ্ল্যাট অন্যদের কাছে বেশি ভাড়ায় তুলে দিয়ে আবার বস্তিতে ফিরে গেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর জানান, অনেকেই দ্বিগুণ ভাড়ায় ফ্ল্যাট সাবলেট দিয়ে নিজেরা পুরোনো বস্তিতে চলে যাচ্ছেন।

এদিকে বর্তমান বিএনপি সরকার বস্তিবাসীদের জন্য আবার নতুন আবাসন পরিকল্পনার কথা ভাবছে। চীন সরকারের সাথে প্রাথমিক আলোচনায় কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক বস্তি উন্নয়নের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে অভিজ্ঞতায় বলে, বাংলাদেশে প্রকল্প শেষ হতে হতে খরচ এই প্রাথমিক হিসাবকে ছাড়িয়ে যায়।

ফ্ল্যাটে থাকার সাধ্য যখন থাকে না

বাউনিয়া বাঁধের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়ার সাথে আরও চৌদ্দশত টাকা দিতে হয় সার্ভিস চার্জ হিসেবে। সিলিন্ডার গ্যাস আর বিদ্যুতের পেছনেই মাসে আরও তিন হাজার টাকা চলে যায়। সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় ১৫ হাজার টাকার ওপর। কিন্তু এখানকার অধিকাংশ মানুষের আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, তাই এই খরচের পর সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আরেক বাসিন্দা ময়না বেগম জানান, বস্তিতে বিদ্যুৎ আর পানি মিলে মাত্র ৫০০ টাকা খরচ হতো। কিন্তু ফ্ল্যাটে আসার পর গ্যাস ও বিদ্যুতের মোটা বিল দিতে গিয়ে খাবারের টাকায় টান পড়ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মানুষের আয়ের কথা না ভেবে পুনর্বাসন প্রকল্প করলে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। বস্তিতে যে পরিবার চার হাজার টাকা খরচ করত, তাকে সাত-আট হাজার টাকা খরচে ফেললে সে আর সেখানে টিকে থাকতে পারে না।

ভাড়া তুলতে সরকারের ভোগান্তি

বাউনিয়া বাঁধের এই প্রকল্প পরিচালনা করছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির প্রকৌশলী আবু হুরায়রা জানান, বরাদ্দ পাওয়া অনেকেই এই ফ্ল্যাটে থাকছেন না। কম আয়ের মানুষেরা বরাদ্দ পেয়ে নিজে না থেকে প্রায় ১০ হাজার টাকায় অন্যদের কাছে ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন।

বর্তমানে এই প্রকল্পে সরকারের প্রায় আড়াই কোটি টাকার ভাড়া বকেয়া পড়ে আছে। তিনি জানান, বর্তমান ভাড়া হিসেবে এই প্রকল্পের মূল টাকা উঠে আসতে প্রায় ১০০ বছর লেগে যাবে, যা আসলে সম্ভব নয়।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় ৯ লাখ বস্তিবাসী বাস করেন। আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মানুষের আয় না বাড়িয়ে শুধু বড় দালানে এনে তুললেই জীবন বদলায় না। বরং এতে সরকারের কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়।

ভাসানটেকের ব্যর্থতা

বাউনিয়া বাঁধের এই চিত্র মিরপুরের ভাসানটেক প্রকল্পের ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৯৮ সালে সরকার বস্তিবাসীদের জন্য সাড়ে সাত হাজার ফ্ল্যাট বানানোর উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীতে তদন্তে দেখা যায়, ২০১৬ সাল পর্যন্ত সেখানে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।

ইউএনডিপির ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্বল তদারকি আর ধনীদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করে দেওয়ার কারণে ভাসানটেক প্রকল্প ব্যর্থ হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, সরাসরি ঘর বানিয়ে দেওয়ার বদলে বস্তিবাসীদের কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া দরকার।

কড়াইলবাসীর অনিশ্চয়তা

বিএনপি সরকারের কড়াইল বস্তিবাসীদের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আমিনবাজারের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসনের মতো এখানেও ৫০০ থেকে ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট বানানোর কথা বলা হচ্ছে। একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাবে কড়াইল, ভাসানটেক ও সাততলা বস্তিতে প্রায় ৩৫ হাজার পরিবারের দেড় লাখ মানুষ বাস করেন।

তবে সবচেয়ে বড় বাধা জমির মালিকানা। কড়াইলের জমির মালিক ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং রাজউক, আর অন্য বস্তিগুলোতে রয়েছে নানা সরকারি সংস্থা। এই বিতর্ক মেটাতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে।

সম্প্রতি রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, কড়াইল বস্তিবাসীরা নাকি ফ্ল্যাট চায় না, তারা যেমন আছে তেমনই থাকতে চায়। তবে স্থানীয় বাসিন্দা শাহীন ইসলাম বলেন, তারা আগে এক ঘরে থাকতেন। এখন নতুন ঘরের কথা শুনে আশাবাদী হয়েছিলেন।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, আবার একই ধরনের বহুতল ভবন বানালে ভাসানটেকের মতোই ভুল হবে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

আদিল মুহাম্মদ খান বহুতল ভবনের বদলে চার-পাঁচ তলা ছোট ভবনের পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো বানাতে এবং দেখাশোনা করতে খরচ অনেক কম হয়। বড় বড় দালান তোলার এই পদ্ধতিটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সবসময় মেলে না।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন প্রথমে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা করলেও সরকার বর্তমানে চীনের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যাতে চীন প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, বস্তিবাসীদের জন্য ২০ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে, যেখানে তাদের কোনো ভাড়া দিতে হবে না। শুধু নিজেদের ব্যবহৃত ইউটিলিটি বিল দিতে হবে।