Image description

দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের দেড় কিলোমিটার অংশে কার্পেটিং করা হয়েছিল গত বছর বর্ষা মৌসুমের পর। কিন্তু এক বছর না যেতেই সড়কটুকুর বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে গর্ত ও খানাখন্দ। ফলে ফের চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে সড়কের ওই অংশ। অবশ্য শুধু এই দেড় কিলোমিটারই নয়; খুলনার জিরোপয়েন্ট থেকে আঠারমাইল পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার মহাসড়কটির ১৬ কিলোমিটার এখন চলাচলের অযোগ্য। অথচ মাত্র ছয় বছর আগেই সড়কটির উন্নয়ন ও সংস্কারে ১৯০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। মাঝে আরও কয়েক কোটি টাকা খরচ হয়েছে সংস্কারকাজে। 

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-২০ সালের মধ্যে ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের আঠারমাইল পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার উন্নয়ন করে ১৮-৩৬ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করা হয়। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যে বিভিন্ন অংশে গর্ত ও উঁচু-নিচু সৃষ্টি হয়। এরপর নির্মাণকাজে নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোজাহার এন্টারপ্রাইজ তিন বছর ধরে মেরামত করে। কিন্তু সড়কের বেহাল কাটেনি। ফলে সওজ নিজস্ব ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে আট দফা সংস্কার করেছে। এ ছাড়া দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় কিলোমিটার কার্পেটিং এবং ২৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার আরসিসি ঢালাই দেওয়া হয়েছে।

সওজের তথ্য অনুসারে, মহাসড়কটি উন্নয়ন ও পরবর্তী সংস্কার মিলিয়ে ছয় বছরে ৩৩ কিলোমিটার ব্যয় ১৮৯ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়ায় ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৬ কিলোমিটার সড়কে ইটের সোলিং বসানো হয়েছিল, কিন্তু তা ভেঙে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও পিচ সরে উঁচু-নিচু হয়ে আছে, বড় অংশ জুড়ে ঢেউয়ের মতো হয়েছে, আবার কোথাও বর্ষার পানিতে আগের ছোট গর্তগুলো বড় হয়ে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দের। গাড়ি চলাচল করছে হেলেদুলে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত সাড়ে চার বছরে মহাসড়কের এই অংশে ২৬৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩৮৩ জন আহত এবং ২৭ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৬৪টি দুর্ঘটনায় ১০৭ জন আহত ও ৬ জন নিহত হন। ২০২৩ সালে ৬৬টি দুর্ঘটনায় ১০৮ জন আহত ও ৪ জন নিহত হন। ২০২৪ সালে ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৫৪ জন আহত ও ৮ জন নিহত হন। ২০২৫ সালে ৫৩টি দুর্ঘটনায় ৬২ জন আহত ও ৭ জন নিহত হন। আর চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৩৪টি দুর্ঘটনায় ৫২ জন আহত ও ২ জন নিহত হয়েছেন।

মহাসড়কের আশপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০১৮-২০ সালে সড়কটি পুনর্নির্মাণের সময় নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল। এ কারণে নির্মাণের পর থেকেই গুটুদিয়া, আঙ্গারদোহাসহ বিভিন্ন অংশে গর্ত ও ফুলে ওঠে। এ কারণে বারবার মেরামতেও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না, শুধু অর্থের অপচয় হচ্ছে।

সড়কের ট্রাকচালক ফিরোজ বলেছেন, সড়কের খানাখন্দে চাকা পড়ে গাড়ি দুলে ঝাঁকুনি দেয়। ঝাঁকুনিতে তার গাড়ির কয়েকটি স্প্রিং ভেঙে গেছে। এ ছাড়া যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। এতে পরিবহনের পেছনে বাড়তি খরচ হচ্ছে। বাসচালক ওসমান সরদার বলেছেন, খানাখন্দের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি ভাঙাচোরা অংশে গাড়ির গতিও কমে যায়। এতে সময় নষ্ট হয়। ইজিবাইকচালক আব্দুল কাদের জানিয়েছেন, ভাঙা ইটের সোলিং, ঢেউখেলানো,  বিটুমিনের কারণে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না, এরপর গাড়ির প্রচুর চাপ। ফলে চালক গর্ত এড়াতে গিয়ে ভুল লেনে যায়, এ কারণে মুখোমুখি সংঘর্ষসহ নানাভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে।

ভুক্তভোগী আহমদ মুসা রঞ্জু নামের একজন পথচারী জানিয়েছেন, তিনি খুলনা নগরীতে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তার গ্রামের বাড়ি কয়রা উপজেলায়। সম্প্রতি মোটরসাইকেলে বাড়ি যাওয়ার পথে গর্তে চাকা পড়ে চারবার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। রাতে চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

বিষয়টি নিয়ে খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমুল হক বলেছেন, সড়ক নির্মাণের পর টেকসইয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমপক্ষে পাঁচ বছর। তবে সড়কটির নিচের মাটি বা ফাউন্ডেশন ভালো না। এ ছাড়া সড়কটির লোড ক্ষমতা ২৭ টন, কিন্তু ৫২ টন ওজনের পাথর নিয়ে ট্রাক চলাচল করে। দুর্বল ফাউন্ডেশন ও ওভারলোড— এ দুটি কারণে সড়কটি দ্রুত নষ্ট হয়ে গেছে। তবে ইটের সোলিংয়ের মধ্যে ৯ কিলোমিটার আরসিসি ঢালাইয়ে রূপান্তরে চারটি প্যাকেজে ১০০ কোটি টাকার টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। বর্ষা মৌসুমের পরই কাজ শুরু হবে।