Image description

পুলিশ বাহিনীতে এখন একসঙ্গে চলছে জবাবদিহির চাপ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যেমন অব্যাহত আছে, তেমনি বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির সিদ্ধান্তও অনেক কর্মকর্তার মধ্যে স্থিরতা ফিরতে দিচ্ছে না। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা এই বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—কোন সিদ্ধান্তটি পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ, আর কোনটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক মূল্যায়নের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পুলিশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ৬৮ জন গ্রেপ্তার এবং ৫৭ জন পলাতক। এর বাইরে ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং ১৪২ জনকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা বা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ বড় ঘটনা ১৩ আগস্টের। ওই দিন জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে ৭ সহকারী পুলিশ সুপার ও ৪৯ পরিদর্শকসহ ৫৬ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। সরকারি চাকরি আইনের ২০১৮ সালের ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী, চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হলে জনস্বার্থে কোনো সরকারি কর্মচারীকে অবসরে পাঠানোর ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের ৩ মে ১৭ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এবং ৫ জুলাই ৩৩ জনকে একই প্রক্রিয়ায় অবসরে পাঠানো হয়েছিল। ২৩ জুলাই আরও ১৭ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর পর জুলাই পর্যন্ত সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছিল ৬৭। পরে আগস্টের ৫৬ জন যুক্ত হওয়ায় বাধ্যতামূলক অবসরের পরিধি আরও বেড়েছে। ফলে প্রশাসনিকভাবে নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে এর প্রভাব পড়ছে।

জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন নেই। জুলাইয়ের আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষণ, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা বেআইনি কর্মকাণ্ডে যাঁদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের ধরন, ব্যক্তির ভূমিকা এবং প্রমাণের মান যাচাই না করে ব্যাপকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তার প্রভাব অন্য কর্মকর্তাদের ওপরও পড়তে পারে। শাস্তির মুখে থাকা কিছু কর্মকর্তার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই না করেই কারও কারও নাম মামলায় এসেছে।

এখানেই পুলিশের বর্তমান সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। বাহিনীর কর্মকর্তারা যদি মনে করেন, দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তনের পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, তাহলে কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। পুলিশের কাজের একটি বড় অংশই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৎ ও আইনসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া কর্মকর্তারা যাতে রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে অনিশ্চয়তায় না পড়েন, সেই নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।

বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। একটি জেলার পুলিশ সুপারকে স্থানীয় অপরাধের ধরন, অপরাধীদের নেটওয়ার্ক, স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক তৈরি করতে সময় লাগে। অল্প সময়ের ব্যবধানে দায়িত্ব বদলে গেলে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ কমে যায়। বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব বিজ্ঞপ্তিতেও ২০২৬ সালে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত বদলি ও পদায়নের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে।

তবে বর্তমান পরিবর্তনের একটি অংশকে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। জুলাইয়ের পর পুলিশের ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিভিন্ন স্থানে থানা ও পুলিশ স্থাপনায় হামলা হয়েছে এবং সহিংসতায় ৪৪ পুলিশ সদস্য নিহত হন। ফলে বাহিনীকে পুনর্গঠন, জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জনগণের আস্থা ফেরানোর চাপ একই সময়ে তৈরি হয়েছে।

এই অবস্থায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে পেশাদারত্বের প্রশ্নটিও জড়িয়ে যাচ্ছে। পুলিশের একটি কার্যকর বাহিনী শুধু কর্মকর্তা বদল বা অবসর দেওয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় না; প্রয়োজন হয় স্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মপরিবেশ। অতীতের ভুলের জন্য দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই কাঠামো তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

পদোন্নতির ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। ২০২৩ সালে ১৪০ জন পুলিশ সুপারকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়া হলেও নিয়মিত পদ খালি না থাকায় তাঁদের অনেকেই আগের দায়িত্বেই ছিলেন। ফলে পদোন্নতি পাওয়ার পরও নিয়মিত পদে দায়িত্ব না পাওয়ার বিষয়টি কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা পেশাগত অগ্রগতির স্বাভাবিক ধারাকে ব্যাহত করে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।

পুলিশের সংস্কারের প্রশ্নে তাই শুধু কতজনকে অবসরে পাঠানো হলো বা কতজনকে বদলি করা হলো—এই হিসাব যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিদ্ধান্তগুলোর ভিত্তি কতটা স্পষ্ট, অভিযোগ যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ এবং ভবিষ্যতের জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে। নির্দিষ্ট অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাজনৈতিক পরিচয় বা পূর্ববর্তী পদায়নের কারণে কাউকে সন্দেহের চোখে দেখা—দুটি বিষয়কে আলাদা রাখা জরুরি।

সম্প্রতি ৫৬ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সরকারি আদেশে ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়া এবং জনস্বার্থের বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অসদাচরণের নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেও অবসরের খবর এসেছে। অর্থাৎ সব সিদ্ধান্তের প্রকৃতি এক নয়। এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা গেলে বাহিনীর ভেতরে যেমন আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছেও প্রশাসনিক পদক্ষেপের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

 

শেষ পর্যন্ত পুলিশের সামনে এখন দুটি কাজ একসঙ্গে। একদিকে জুলাইয়ের সহিংসতা ও অতীতের অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, অন্যদিকে একটি স্থিতিশীল ও পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলা। প্রথমটি করতে গিয়ে দ্বিতীয়টি দুর্বল হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। আবার সংস্কারের নামে জবাবদিহির প্রক্রিয়া থেমে গেলেও জনগণের আস্থা ফিরবে না।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে অপরাধের দায় ব্যক্তির ওপর নির্ধারিত হবে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্ট থাকবে এবং পদায়ন-পদোন্নতিতে পেশাগত যোগ্যতা অগ্রাধিকার পাবে। পুলিশকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাওয়া একটি বাহিনী না বানিয়ে রাষ্ট্রের স্থায়ী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোই হতে পারে এই সময়ের সবচেয়ে বড় সংস্কার। সরকারি নথিতে বদলি, পদোন্নতি ও অবসরের ধারাবাহিক আদেশ জারি থাকার বিষয়টিও দেখাচ্ছে যে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখনো চলছে।