পাবনার ঈশ্বরদী ইপিজেড ও রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালপত্র পরিবহনের জন্য প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ঈশ্বরদী-রূপপুর রেলপথ। উদ্বোধনের পর প্রায় সাড়ে তিন বছরে দু-একটা শান্টিং মালবাহী খালি বগি আর রেল কর্মকর্তাদের নিয়ে মোটরট্রলি ছাড়া এ রেলপথে চলেনি কোনো ট্রেন। ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধন করা ‘রূপপুর স্টেশন’ বর্তমানে ‘ওয়াগন ইয়ার্ড’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটারের রেলপথটি কাশবন, ঘাস, লতাপাতা ও জঙ্গলে ঢেকে গেছে।
২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাঁকজমক করে এমপি, রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে ঈশ্বরদী-রূপপুর রেলপথ এবং রূপপুর রেলস্টেশন ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (বর্তমানে ক্ষমতাচ্যুত) শেখ হাসিনা। স্টেশনটি হার্ডিঞ্জ সেতুর কাছে ফাঁকা স্থানে হওয়ায় অনেকে সেখানে অবসর সময়ে বেড়াতে যান। কিন্তু স্টেশনের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি গত সাড়ে তিন বছরে।
জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি প্রকল্পের অভ্যন্তরে পৌঁছাতে এবং লোড-আনলোডের জন্য তৈরি করা হয় রূপপুর রেলস্টেশন ও ঈশ্বরদী-রূপপুর রেলপথ। এ ছাড়া ঈশ্বরদী ইপিজেডের মালপত্র এই রেলপথে পরিবহনের কথাও ছিল। উদ্বোধনের প্রায় সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও এক ছটাক পণ্যও পরিবহন হয়নি এই রেলপথে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলপথ ও স্টেশন নির্মিত হলেও এখনও প্রকল্পের বিভিন্ন মালপত্র ও ভারী যন্ত্রাংশ নদী ও সড়কপথেই আনা হচ্ছে রূপপুর প্রকল্পে। রূপপুর প্রকল্প ও রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণ করে রেল কর্তৃপক্ষ। ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশন থেকে ঈশ্বরদী জংশন স্টেশন হয়ে রূপপুর পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটার রেলপথ ও রূপপুর নামে একটি রেলস্টেশন নির্মাণ করা হয়।
এর মধ্যে ১৩টি লেভেল ক্রসিং, সাতটি বক্স কালভার্ট নির্মাণ এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য কম্পিউটার বেইজ কালার লাইট সিগন্যালিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়। এসব কর্মযজ্ঞে ব্যয় হয় ৩৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এই রেলস্টেশন ও রেলপথ উদ্বোধনের সময় প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছিলেন, এখান থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালপত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে। পাশাপাশি ইপিজেডের মালপত্র পরিবহন করা হবে।
সম্প্রতি রূপপুর স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পাকশীর পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে আধুনিক স্টেশনটি জনশূন্য। রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। প্ল্যাটফর্মে ময়লা জমে আছে। টিকিট কাউন্টার, মালপত্র বুকিং কক্ষ, অতিথিশালা, ভিআইপি কক্ষ, প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার, স্টেশন মাস্টার, সহকারী স্টেশন মাস্টারের কক্ষসহ সব কক্ষই তালাবন্ধ। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক সদস্য বলেন, ‘স্টেশন থেকে যে রাস্তা রয়েছে, সেটি হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচ দিয়ে। এদিক দিয়ে মালপত্র আনা-নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। শুনেছি এজন্যই নাকি মালপত্র লোড-আনলোড করা হচ্ছে না।’
পাকশী বিভাগীয় রেল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই রেলপথে পাকশী বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনে মোটরট্রলি চালানো হয়ে থাকে। স্টেশন ইয়ার্ডে রেলের নতুন কিছু ওয়াগন ও কোচ রাখা হয়েছে, যেগুলো ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা। স্থান সংকুলান ও নিরাপত্তার অভাবে বর্তমানে রূপপুর স্টেশনে এসব কোচ এনে রাখা হয়েছে। নতুন রেলপথ দিয়ে রূপপুর প্রকল্পের জন্য কোনো মালপত্র এখনও আনা-নেওয়া হয়নি।
পাকশী বিভাগীয় বাণ্যিজ্যিক কর্মকর্তা মোশারেফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, এখনও এ রেলপথে বাণিজ্যিকভাবে কোনো ট্রেন চলাচল করেনি।
রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবু হেনা মোস্তফা আলম বলেন, রূপপুর প্রকল্পের জন্য এ রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। তারাই এটি ব্যবহার করবে। এখন হয়তো ব্যবহার হচ্ছে না, কিন্তু ভবিষ্যতে রূপপুর প্রকল্পের কাজে অনেক বেশি ব্যবহার হতে পারে।