Image description
মোট মজুতের ৭৩.৮২ শতাংশ এরই মধ্যে ব্যবহার হয়েছে

দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস খাত ক্রমেই গভীর সংকটের দিকে এগোচ্ছে। একদিকে বছর বছর কমছে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন, অন্যদিকে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে উত্তোলনযোগ্য মজুত। ফলে বাড়তি চাহিদা মেটাতে সরকারকে ক্রমে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নির্ভর হতে হচ্ছে। পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে দেশের গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে দেশের অধিকাংশ বড় গ্যাসক্ষেত্রের মজুতও শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো। সে সময় দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানায় উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৩০১ মিলিয়ন ঘনফুট। এ ছাড়া তিতাসে ৪৪৩ মিলিয়ন, জালালাবাদে ২৩৬ মিলিয়ন ও হবিগঞ্জে ১৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো।

পরের বছর ২০২১ সালে উৎপাদন সামান্য কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে। তবে ২০২২ সাল থেকে উৎপাদন হ্রাসের প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই বছর উৎপাদন নেমে আসে ১ হাজার ৪৩৬ মিলিয়ন ঘনফুটে। ২০২৩ সালে দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হয় ১ হাজার ৩১১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ২০২৪ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫৮ মিলিয়ন ঘনফুটে।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে দেশের গ্যাস উৎপাদন নেমে আসে ১ হাজার ১৬৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ ২০২০ সালের তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ৩০ শতাংশ।

উৎপাদন হ্রাসের প্রভাব পড়েছে দেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতেও। ২০২০ সালে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে যেখানে ১ হাজার ৩০১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯৭২ মিলিয়ন ঘনফুটে। একই সময়ে তিতাসে উৎপাদন ৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ৩৪৪ মিলিয়নে, হবিগঞ্জে ১৮৭ মিলিয়ন থেকে ১০৮ মিলিয়নে এবং জালালাবাদে ২৩৬ মিলিয়ন থেকে ১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে।

পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে চলতি বছর। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ আগস্ট দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে মাত্র ৯০৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে উৎপাদন হয় ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ৫৬১ মিলিয়ন ঘনফুট কম। জালালাবাদ থেকে উত্তোলিত হয়েছে ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সামগ্রিকভাবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

উৎপাদন কমায় বাড়ছে এলএনজি আমদানিদেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।

২০২০ সালে এলএনজি সরবরাহের পরিমাণ ছিল দৈনিক গড়ে ৫০৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৯০০ মিলিয়ন, ২০২২ সালে ৯২২ মিলিয়ন এবং ২০২৩ সালে ৯৭৩ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছে। ২০২৪ সালে সাময়িকভাবে সরবরাহ কমে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামলেও ২০২৫ সালে তা আবার ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।

ফুরিয়ে আসছে গ্যাসের মজুত জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে এরই মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুতের প্রায় ৭৪ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমান হারে উৎপাদন অব্যাহত থাকলে অবশিষ্ট মজুত আরও ১০-১১ বছর চলতে পারে। ফলে ২০৩১ সালের পর বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট উত্তোলনযোগ্য মজুত ২৯ হাজার ৯২৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সাল পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে ২২ হাজার ৯১ বিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট মজুদের ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ এরই মধ্যে ব্যবহৃত হয়েছে।

বর্তমানে অবশিষ্ট মজুতের বড় অংশ রয়েছে মাত্র তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে—তিতাস, রশিদপুর ও কৈলাসটিলায়। এ তিন ক্ষেত্রেই অবশিষ্ট মজুতের পরিমাণ ৬ হাজার ৩৬৭ বিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট অবশিষ্ট মজুতের ৮১ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এর মধ্যে রশিদপুরে রয়েছে ২ হাজার ৩৮২ বিলিয়ন ঘনফুট, কৈলাসটিলায় ২ হাজার ৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট এবং তিতাসে ১ হাজার ৯২৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত। অন্যদিকে হবিগঞ্জ, শ্রীকাইল ও বেগমগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রের মজুত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিবিয়ানা ও জালালাবাদ ক্ষেত্রের মজুতও কাগজে-কলমে শেষ হয়ে গেলেও এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যে কোনো সময় এসব ক্ষেত্রের উৎপাদন দ্রুত কমে যেতে পারে।

গ্যাসের চাহিদা বাড়ছেই দেশে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন কমলেও চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ চাহিদা ৫ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে সরকারি পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে এ চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। ফলে সরকারকে ক্রমে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ একটি নতুন গ্যাসকূপ খননে বাপেক্সের গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হওয়া স্থানীয় গ্যাসের অর্ধেকেরও বেশি আসে শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে। কয়েক বছর ধরে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে এসব ক্ষেত্রের মজুত দ্রুত কমে এসেছে। অন্যদিকে, স্থানীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালনাধীন গ্যাসক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য মজুত থাকলেও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি।

তাদের ভাষ্য, দেশে গ্যাসের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এখনই নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন এবং গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার না করলে আগামী দশকে দেশের গ্যাস খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন কালবেলাকে বলেন, গ্যাসকূপের মজুত কমে আসা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু নিয়ম হচ্ছে প্রতিনিয়ত নতুন গ্যাসকূপের অনুসন্ধান ও খনন করা। যেটা বিগত সরকারগুলো করেনি। ফলে সামনে গ্যাসের একটা সংকট তৈরি হবে। কারণ এলএনজি দিয়ে একটা দেশের গ্যাসের চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারকে এখন অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।