‘ঢাকা এরিয়া’ নামের একটি কোম্পানির দুটি প্রভিডেন্ট ফান্ড ট্রাস্টের আমানত রাখে ঢাকা ব্যাংকের একটি শাখায়। আয়কর আইন অনুযায়ী, আমানতের মুনাফায় উৎসে কর হবে ২০ শতাংশ। কিন্তু ঢাকা ব্যাংক কেটে রেখেছে ১০ শতাংশ। ডেলিমাস অ্যাপারেলস, সান কমিউনিকেশন্স, রিভার পয়েন্ট লিমিটেড নামের তিন প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি মর্যাদায় তিনটি তহবিল জমা রাখা হয় একই ব্যাংকে। নিয়ম অনুযায়ী, রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র না থাকলে, এসব ফান্ডের মুনাফায় উৎসে কর হবে ৩০ শতাংশ। কিন্তু ঢাকা ব্যাংক কেটেছে ১৫ শতাংশ করে। এভাবে কম হারে কর কাটায় রাজস্ব-বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। নির্ধারিত হারে কর কাটা এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও ঢাকা ব্যাংক আমলে নিচ্ছে না।
শুধু ঢাকা ব্যাংকই নয়, দেশের প্রচলিত আয়কর আইন উপেক্ষা করে নিজেদের মতো উৎসে কর কেটে রাখছে আরও তিনটি ব্যাংক। এগুলো হলো—সিটি ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত কৃষি ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক। আবার এই চার ব্যাংক কিছু কোম্পানির আমানতের মুনাফার বিপরীতে করই কাটছে না। কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে কর কাটলেও সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যাংকের তহবিলে রেখে দিচ্ছে। কর নিয়ে এই যথেচ্ছ ব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে কর অঞ্চল-১-এর নিরীক্ষায়।
এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চেয়ে ইতোমধ্যে কর অঞ্চল থেকে চার ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর আগে বিষয়টি নিয়ে আয়কর কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করে। আর এই আয়কর আইন যথাযথ পালনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নির্দেশনাও দেয়।
এ বিষয়ে কর অঞ্চল-১-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘ঢাকা ব্যাংক কয়েক বছর ধরে এই ধরনের অনিয়ম করে আসছে। বিষয়টি নিরীক্ষায় স্পষ্ট হয়েছে। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দেওয়া কিছু সুবিধা গোপন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। এ ছাড়া কোম্পানিটি বিদ্যমান আইনের তোয়াক্কা না করায় এনবিআর থেকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জানা যায়, সিটি ব্যাংক পিএলসিতে বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের (বিএসআরএম) এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা রাখা আছে। এ ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটার পরিবর্তে ৫ শতাংশ হারে কাটছে ব্যাংকটি। আরও কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে এভাবে নির্ধারিত হারের চেয়ে কম কর কেটে রাখায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে দি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিনের মুঠোফোনে কল দিলে তিনি ধরেননি। পরে বিষয়টি উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠালেও কোনো সাড়া মেলেনি।
একইভাবে কৃষি ব্যাংক ঢাকা ওয়াসার পেনশন ফান্ডের ক্ষেত্রে করহার ১০ শতাংশ হলেও ব্যাংকটি কাটছে ৫ শতাংশ। এ ছাড়া বিজেএমসি কর্মচারী ভাতা ট্রাস্ট, বিজেএমসি কর্মচারী অবসর ভাতা ট্রাস্টের ক্ষেত্রে উৎসে কর ২০ শতাংশের স্থলে ১০ শতাংশ কেটে রেখেছে কৃষি ব্যাংক। এতে সরকারের নির্ধারিত হারের চেয়ে অর্ধেক রাজস্ব হারাচ্ছে। একই ধরনের অনিয়ম ঘটছে অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও। ব্যাংকটি নির্ধারিত হারে কর কাটছে না। একই সঙ্গে সঠিক সময়ে সরকারি কোষাগারে করের টাকা জমা দিচ্ছে না।
জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি আনোয়ারুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘উৎসে কর যে হারে আছে, সেই হারে কেটে রাখার কথা। যারা এই আইনের ব্যত্যয় করবে, তারা শাস্তি পাবে।’
কর অঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, কর আদায়ে গরমিলের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে অব্যাহতিপ্রাপ্ত করদাতার তালিকা চেয়েও ঢাকা ব্যাংককে চিঠি দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কিন্তু এই চিঠির কোনো জবাব দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। পরে গত জুলাইয়ে আরেকদফা চিঠি দেন কর কর্মকর্তারা। অভিযোগ উঠেছে, আমানত ধরে রাখতেই বেআইনি কৌশল নিয়েছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর এমন আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি এনবিআরের অনুরোধে একটি আদেশ জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে করহার, জমার নির্দেশনা ও অনিয়মের শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। কর কর্মকর্তাদের দাবি, কর ফাঁকি দিতেই এমন পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। ফাঁকি ধরতে গাড়ি সুবিধাসহ ঢাকা ব্যাংকের ছয় বছরের নানা তথ্য চেয়েছে রাজস্ব বোর্ড।
বিদ্যমান আয়কর আইনের ব্যত্যয়ের বিষয়টি জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘ব্যাংক আয়কর বা এক্সাইজ ডিউটি কেটে রেখে জমা দেবে না, বিষয়টি অবিশ্বাস্য ছিল। আমাদের পরিদর্শনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সময়মতো করের টাকা না দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছি। সর্বশেষ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে। নির্দেশনা জারি করাটাও বিব্রতকর হলেও করের টাকা কেটে রেখে যারা জমা দেয় না, তাদের বিষয়ে খুব কঠোর বাংলাদেশ ব্যাংক।’ নতুন পরিদর্শনে এসব বিষয় দেখা হবে বলেও জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুখপাত্র।
এনবিআর সূত্র জানায়, ঢাকা ব্যাংকের এসব স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি জেনে গত জুনে ঢাকা ব্যাংককে চিঠি দেয় এনবিআরের কর অঞ্চল-১। এই চিঠিতে ঢাকা ব্যাংকে জমা হওয়া সব ফান্ড, ট্রাস্ট ও পিএসআরবিহীন আমানতের তথ্য চায়। এতেও কোনো ধরনের পাত্তা দেয়নি ঢাকা ব্যাংক পিএলসি। পরবর্তী সময়ে ২১ জুন ঢাকা ব্যাংককে আরও একটি চিঠি দেয় এনবিআর। যেখানে অভিযোগ করা হয়, উৎসে করের টাকা সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত সময়ে জমা না দিয়ে রেখে দেওয়া হচ্ছে ব্যাংকের নিজস্ব তহবিলে। যার ফলে, সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হচ্ছে ঢাকা ব্যাংক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ওসমান এরশাদ ফয়েজ দাবি করেন, ঢাকা ব্যাংক একটি কমপ্লায়েন্স ব্যাংক। আয়কর-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তারা খুবই সচেতন।
তিনি বলেন, আয়কর কর্তৃপক্ষের পাওনা ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে এবং আয়কর কর্তৃপক্ষ তাদের ‘থ্যাংকস লেটার’ও দিয়েছে বলে জানান তিনি।