চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা মেগা প্রজেক্ট বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা ‘অবাস্তব প্রকল্প’ বলে দাবি করেছেন পরিবেশ ও পানিসম্পদ-বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। আজ সোমবার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ‘তিস্তা নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
বুয়েটের সাবেক এই অধ্যাপক বলছিলেন, ‘আপনারা দেখালেন তিস্তার পাড়ে প্রচুর আন্দোলন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী অঙ্গীকার করেছেন মহাপরিকল্পনা হবে। এই মহাপরিকল্পনা আমি এখনো বুঝিনি। ইন্টারনেট ঘেঁটে ১২-১৫ পৃষ্ঠার একটা ডকুমেন্ট পেয়েছি; যেটা উপস্থাপিত হয়েছিল। এটায় এ ফোর সাইজের পৃষ্ঠায় একটা ড্রইং আছে। নদীটা ন্যারো করা হবে। এটা অবাস্তব প্রকল্প।’
ভারতের সঙ্গে তিস্তা নিয়ে চুক্তি করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন ড. নিশাত। তিনি বলেন, ‘সমস্যাগুলো সারসংক্ষেপ করলে দেখা যায়— প্রথমটি বন্যা, দ্বিতীয়টি নদী ভাঙন এবং তৃতীয়টি শুকিয়ে যাওয়া। শুকনো স্থানে পানি ধরে রাখার যে কথা বলা হচ্ছে, এটা শিগগির করা সম্ভব না। কারণ পানি কোথায়? লালমনিহাটের হাতীবান্ধার ডালিয়ার পরে যেটুকু পানি আসবে; এই পানি ধরে রেখে কোনো লাভ নেই। তাহলে সমাধানটা কি? সমাধান হচ্ছে ভারতের সঙ্গে তিস্তা নিয়ে একটা চুক্তি করতে হবে। এটাই টপ প্রায়োরিটি।’
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরে অগ্রাধিকারের তালিকায় গঙ্গা ও তিস্তার পানি চুক্তির বিষয়টি থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, তিস্তা চুক্তি হলে জানতে পারব কতটুকু পানি পাওয়া যাবে। রিসোর্স এভেলেবিলিটি নিশ্চিত হলেই পরিকল্পনা সম্ভব। যদিও এই মুহূর্তে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ভাঙন ঠেকানোর কাজ শুরু করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বুয়েটের পানি সম্পদ কৌশল বিভাগ এই সেমিনারের আয়োজন করে। বুয়েটের একাডেমিক কাউন্সিল ভবনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। বিশেষ অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ও বুয়েটের উপাচার্য ড. একরামুল হক।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি
বক্তব্যে তিস্তা প্রকল্প ‘খুব চ্যালেঞ্জিং’ বলে জানান শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, ‘কাজ করতে এসে আমরা এই প্রকল্পটা খুব চ্যালেঞ্জিং মনে করছি। যেহেতু প্রত্যাশার জায়গা এত বেশি; বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের পাঁচটা জেলার মানুষের। আমরা যদি এটা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হই, ওই এলাকার মানুষ আরও বেশি ক্ষতির শিকার হবে। সমস্যাও দিন দিন বাড়তে পারে। এজন্য এই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আন্তরিক উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে প্রায় আলোচনা করেন। আমাদের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। প্রকল্পটি কোন পর্যায়ে আছে, কীভাবে আছে তিনি জানার চেষ্টা করেন। এটা দৃশ্যমান করার জন্য আমাদের দিকনির্দেশনা দেন।’
শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি মন্তব্য করেন, তিস্তা নিয়ে একটা সমন্বিত সমাধান দরকার, যার ভিত্তিতে এটার নকশা, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন হবে।
অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি তিস্তাপাড়ের মানুষ। রংপুর রঙেরসে ভরপুর ছিল। দেশের শস্য ভাণ্ডার ছিল। গোলাভরা ধান ছিল। সেই রংপুর এখন বিরান ভূমি। সেই তিস্তাপাড়ে হাহাকার দেখি। জনপ্রতিনিধি হয়ে চাই, আমরা কত তাড়াতাড়ি তাদের হাহাকার থেকে মুক্ত করতে পারব?’
সেমিনারে তিস্তা নদীর সমস্যা ও সমাধান নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাসফিকুস সালেহীন, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. সরফরাজ বান্দা।