সারা জীবন কৃষিকাজ করে সংসার চালিয়েছেন আবু তাহের মজুমদার (৭৫)। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে বড় করেছেন। স্ত্রীকে নিয়ে কোনোরকমে চলছিল তাঁর সংসার। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে এসে এক ছেলের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে থানায় যেতে হয়েছিল তাঁকে। অভিযোগ নিয়ে থানার ফটক দিয়ে ঢোকার সময় হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
গতকাল শনিবার দুপুরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার সামনে এই ঘটনা ঘটে। আবু তাহের মজুমদারের বাড়ি উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের বাংপাই গ্রামে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বড় ছেলে শহিদুল ইসলাম ওরফে শরীফের বিরুদ্ধে আবু তাহেরকে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। ছেলের আচরণ নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিসও হয়েছে। তবে সমস্যার সমাধান হয়নি।
তবে বাবাকে নির্যাতন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শহিদুল ইসলাম। আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি মাদক কারবারি বা মাদকসেবী নই, আমি একজন প্রবাসী। ছুটিতে দেশে এসেছি। কয়েক দিন পরই চলে যাব। বাবাকে কোনো ধরনের নির্যাতন করার প্রশ্নই ওঠে না।’
গতকাল সকালে ছেলের সঙ্গে ঝামেলার পর দুপুরে ছেলের বিরুদ্ধে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ করতে থানায় যান আবু তাহের। থানার সামনে একটি কম্পিউটার দোকান থেকে নিজের অভিযোগ লিখিয়ে নেন। এরপর অভিযোগপত্র হাতে থানার ভেতরে ঢোকার সময় মূল ফটকের কাছেই হঠাৎ তিনি মাটিতে পড়ে যান। পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে আবু তাহেরের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। গতকাল সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়ি নিয়ে দাফন করা হয়।
চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ৭৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
আবু তাহেরের এক প্রতিবেশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, ছেলে শহিদুল দুবাই থাকেন। ২০১৯ সালে তিনি সেখানে যান। প্রায় আড়াই মাস আগে ছুটিতে দেশে আসেন। দেশে ফেরার পর শহিদুল মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বিদেশে উপার্জিত টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর পরিবারের লোকজনের কাছে টাকা চাইতেন এবং এ নিয়ে ঝামেলা করতেন। এ নিয়ে বাবা তাঁকে শাসান। ছেলে বাবার গায়ে হাত তোলেন বলে তিনি শুনেছেন। নিরুপায় হয়ে আবু তাহের থানায় অভিযোগ করতে গিয়েছিলেন।
বাবাকে নির্যাতন করার অভিযোগ অস্বীকার করে শহিদুল ইসলাম দাবি করেন, তাঁর বাবার কিছুদিন ধরে মানসিক সমস্যা ও শ্বাসকষ্ট ছিল। গতকাল সকালে তিনি খাটে শুয়ে ছিলেন। তখন তাঁর বাবা দা দিয়ে তাঁকে কোপ দেন। এরপর বাবা কী করবেন বুঝতে না পেরে থানায় চলে যান বলে দাবি করেন তিনি।