Image description

এই দুই বিপরীতমুখী প্রবাহের মাঝখানে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক জনসমর্থনে জামায়াতের প্রভাব ঠেকাতে কি বিএনপি হেফাজতের জামায়াতবিরোধী আলেমদের একটি পাল্টা শক্তিকেন্দ্র হিসেবে সামনে আনছে?

সালাহউদ্দিন–নজরুলের ধারাবাহিক যোগাযোগ, জুনায়েদ আল হাবিবকে নির্বাচনী ছাড়, মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর তীব্র মওদুদী বিরোধিতা এবং সাত কওমি দলের নতুন সমন্বয়। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কওমি জনসমর্থনকে জামায়াতের বলয়ে যেতে না দেওয়াই কি বিএনপির কৌশল?

 

বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতিতে গত এক বছরে নীরবে যে পুনর্বিন্যাস ঘটেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ক্রমেই উঠে এসেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। একদিকে তার ধারাবাহিক ও তীব্র জামায়াত ও মওদুদীবিরোধী অবস্থান, অন্যদিকে তার সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ। এই দুই প্রবণতা পাশাপাশি এগিয়েছে। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামী চেষ্টা করেছে মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কওমি ঘরানার একাধিক দলকে নিজেদের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে ধরে রাখতে।

 

এই দুই বিপরীতমুখী প্রবাহের মাঝখানে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক জনসমর্থনে জামায়াতের প্রভাব ঠেকাতে কি বিএনপি হেফাজতের জামায়াতবিরোধী আলেমদের একটি পাল্টা শক্তিকেন্দ্র হিসেবে সামনে আনছে?

 

প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে গত ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজত আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করায়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ যে যোগাযোগ ২০২৫ সালে বিএনপির দলীয় পর্যায়ে শুরু হয়েছিল, তা এখন সরকার প্রধানের সরাসরি যোগাযোগ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

 

শুরুটা সালাহউদ্দিন–নজরুলের হাত ধরে

 

এই সম্পর্কের দৃশ্যমান সূচনা আরও আগে। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এবং নজরুল ইসলাম খান চট্টগ্রামে গিয়ে মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর সেপ্টেম্বরেও সালাহউদ্দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। একই সময় হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আয়োজিত একটি জাতীয় সম্মেলনেও বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে সালাহউদ্দিন উপস্থিত হন। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে তখনই বলা হয়েছিল, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে হেফাজতের নেতৃত্ব বিএনপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ‘ভোটব্যাংক’ ঘিরেই রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রহ বাড়ছে।

 

bnp Hefazot

 

সালাহউদ্দিন অবশ্য এ যোগাযোগকে রাজনৈতিক দর-কষাকষি হিসেবে স্বীকার করেননি। তার বক্তব্য ছিল, বাবুনগরী একজন বয়োজ্যেষ্ঠ আলেম ও মুরব্বি। তার কাছে তিনি দোয়া চাইতে গিয়েছিলেন। কিন্তু একই সময় একাধিক সাক্ষাৎ, কওমি নেতৃত্বের অনুষ্ঠানগুলোতে বিএনপির উপস্থিতি এবং পরবর্তী নির্বাচনী সমঝোতা। সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাগুলোকে শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

 

এই জায়গায় সালাহউদ্দিন আহমদ ও নজরুল ইসলাম খানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দুজনই বিএনপির অভিজ্ঞ নেগোশিয়েটর। কওমি আলেমদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরিতে তাদের সরাসরি মাঠে নামানো থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট। বিএনপি কওমি বলয়কে নির্বাচনী ও বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে রাখেনি।

 

বিএনপির জন্য সমস্যাটা কোথায় তৈরি হয়েছিল?

 

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইসলামপন্থী রাজনীতিতে জামায়াতের প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। জামায়াত শুধু নিজেদের দলীয় সাংগঠনিক শক্তি নিয়েই এগোয়নি। রবং কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক কয়েকটি রাজনৈতিক দলকেও একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করেছে।

 

২০২৫ সালে জামায়াতের সঙ্গে অভিন্ন কর্মসূচিতে থাকা ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা হেফাজতেরও কেন্দ্রীয় পদে ছিলেন। অর্থাৎ হেফাজতের সাংগঠনিক কাঠামোর একটি অংশ এবং জামায়াতের রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সক্ষতা তৈরি হয়েছিল।

 

এ পরিস্থিতি বিএনপির জন্য একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ জামায়াত যদি নিজস্ব সাংগঠনিক ভোটের সঙ্গে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আলেম-ওলামা এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের একটি বড় অংশের সমর্থনও একই রাজনৈতিক বলয়ে আনতে পারে, তাহলে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে জামায়াতের দর-কষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

 

প্রথম আলোর ২০২৫ সালের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছিল, মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর জামায়াতবিরোধী অবস্থান সে সময় বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে সহায়ক হয়ে উঠেছিল। ঠিক এখানেই বাবুনগরী বিএনপির রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

 

আদর্শিক ফাটল: ‘মওদুদীর ইসলাম’ বনাম কওমি-দেওবন্দি ধারা

 

জামায়াত ও কওমি-দেওবন্দি আলেমদের ঐতিহাসিক মতপার্থক্য নতুন নয়। জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি আবুল আ'লা মওদুদীর রচনায়। অন্যদিকে হেফাজতের মূল ধর্মীয় ভিত্তি ভারতীয় উপমহাদেশের দেওবন্দি-কওমি ধারা। মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এই পুরোনো মতপার্থক্যকে সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত রাজনৈতিক ভাষায় সামনে এনেছেন।

 

মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী

 

২০২৫ সালে তিনি প্রকাশ্যে জামায়াতকে ‘সহিহ ইসলামী দল নয়’ বলে মন্তব্য করেন এবং মওদুদীর চিন্তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে তাঁর অবস্থান আরও তীব্র হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরকে সমর্থন করে জামায়াতকে ভোট দেওয়ার বিরুদ্ধে ধর্মীয় ভাষায় কঠোর বক্তব্য দেন। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল বড়। কারণ এখানে শুধু একজন আলেম জামায়াতের সমালোচনা করছেন না। বরং হেফাজতের আমির তাঁর ধর্মীয় কর্তৃত্ব ব্যবহার করে জামায়াতের বিপরীতে বিএনপির একজন প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন করছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, একই সময়ে বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদও প্রায় একই আদর্শিক ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেন।

 

২০২৫ সালের ১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের একটি আলেম সম্মেলনে সালাহউদ্দিন বলেন, তারা ‘মওদুদীর ইসলাম’-এর অনুসারী নন, তাঁরা ‘মদিনার ইসলাম’-এর অনুসারী। একই অনুষ্ঠানে জমিয়ত ও হেফাজতের একাধিক শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। বাবুনগরীর ধর্মতাত্ত্বিক আপত্তি এবং বিএনপি নেতার রাজনৈতিক বক্তব্য একই লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করছিল মওদুদী ও জামায়াতের রাজনৈতিক-ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা।

 

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র জুনায়েদ আল হাবিব

 

এই কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব। তিনি একদিকে হেফাজতে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি। জমিয়ত ঐতিহাসিকভাবে কওমি-দেওবন্দি রাজনৈতিক ধারার অন্যতম পুরোনো সংগঠন। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি জমিয়তের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী সমঝোতা করে চারটি আসন ছেড়ে দেয়। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি দেওয়া হয় জুনায়েদ আল হাবিবকে। বিএনপি সেখানে নিজেদের প্রার্থী না দিয়ে তাঁকে জোট সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে সামনে আনে। এ সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্যও কম ছিল না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির পরিচিত মুখ রুমিন ফারহানা মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তারপরও বিএনপি আসনটি জমিয়তের জুনায়েদকে ছেড়ে দেয়।

 

জুনায়েদ হেফা

 

শেষ পর্যন্ত রুমিন স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন এবং জুনায়েদকে পরাজিত করেন। এই ফলাফল আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যও দেখিয়েছে। কওমি আলেমের রাজনৈতিক সমর্থন বা জোট মানেই সংশ্লিষ্ট এলাকার সব ধর্মপ্রাণ বা কওমি-ঘেঁষা ভোট একটি বাক্সে চলে যায় না। ‘কওমি ভোটব্যাংক’ ধারণাটি তাই বাস্তবে অনেক বেশি বিভক্ত। তবে জুনায়েদকে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত করার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা ছিল একেবারেই দৃশ্যমান।

 

অন্য মেরুতে মামুনুল হক

 

বিএনপি যখন জমিয়ত ও হেফাজতের একাংশের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করছে, তখন আরেক প্রভাবশালী কওমি নেতা মামুনুল হক বিপরীত সমীকরণে অবস্থান নেন।

 

মামুনুল হক

 

মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর নির্বাচনী সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ শরিক হয়। আসন সমঝোতায় দলটিকে ২০টি আসন দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচন সামনে রেখে মামুনুল জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে জোটের আসন বণ্টন নিয়েও আলোচনা করেন। অর্থাৎ একই হেফাজত-কওমি পরিমণ্ডলে তৈরি হয় দুই ধরনের রাজনৈতিক ধারা। মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী–জমিয়ত–জুনায়েদ ঘরানার সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা, আর অন্যদিকে মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দলের জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা। এখানেই কওমি রাজনীতির বিভাজনটি সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়।

 

ভোটের পর শুরু দ্বিতীয় পর্ব

 

নির্বাচনের পর ঘটনাপ্রবাহ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন সরে দাঁড়ায়। এরপর জুলাইয়ে খেলাফত মজলিসও জোটের কর্মসূচি থেকে সরে যায়। আসন সমঝোতায় প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, জোটের ভেতরে গুরুত্ব বণ্টন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্যকে এসব সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দলগুলো উল্লেখ করেছে। কিন্তু মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তখনও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। ২৬ জুলাই প্রথম আলোকে মামুনুল বলেন, ১১–দলীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এই সময়েই মঞ্চে আবার সামনে আসেন মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।

 

বাবুনগর মাদ্রাসায় সাত দলের বৈঠক

 

১৬ জুলাই ২০২৬ ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে কওমি ধারার সাতটি রাজনৈতিক দল বৈঠক করে। সেখানে ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলগুলো ভবিষ্যতে একসঙ্গে পথচলার বিষয়ে নীতিগতভাবে আলোচনা করে। প্রক্রিয়াটি ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছিল। অর্থাৎ যে দলগুলোর একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী বা রাজনৈতিক সমঝোতায় ছিল, তাদের সবাইকে আবার বাবুনগরীকেন্দ্রিক একটি পৃথক কওমি ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ শুরু হয়।

 

বাবুনগর মাদরাসা

 

এখানেই জামায়াতের সন্দেহ প্রকাশ্যে আসে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, সাত দলের এই উদ্যোগের পেছনে বিএনপি সরকারের ইন্ধন রয়েছে। তবে তিনি এ দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ হাজির করেননি। হেফাজতের পক্ষ থেকে আবার বলা হয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক জোট ভাঙা নয়। ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে ধর্মীয় বিষয়ে সমন্বয় ও পারস্পরিক বিরোধ কমানো। মামুনুল হকও বলেন, বাবুনগরীর উদ্যোগটিকে তিনি রাজনৈতিক জোট নয়, ধর্মীয় বিষয়ে বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন।

 

তাহলে কি সত্যিই ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’?

 

বিএনপির কেন্দ্র থেকে এমন কোনো প্রকাশ্য দলিল বা নির্দেশনা নেই যেখানে বলা হয়েছে মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীকে ব্যবহার করে জামায়াতের সঙ্গে থাকা কওমি দলগুলোকে ভাঙতে হবে। তাই এটিকে প্রমাণিত ‘ডিভাইড এন্ড রুল অপারেশন’ দাবি করা সঠিক হবে না। কিন্তু ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের সম্ভাবনা সামনে আনে।

 

২০২৫ সালের আগস্ট থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ ও নজরুল ইসলাম খানের বাবুনগরীর সঙ্গে যোগাযোগ। এরপর বিএনপির জমিয়তের সঙ্গে আসন সমঝোতা। জুনায়েদ আল হাবিবকে গুরুত্বপূর্ণ আসন ছেড়ে দেওয়া; বাবুনগরীর প্রকাশ্য জামায়াতবিরোধিতা। সালাহউদ্দিনের ‘মওদুদী ইসলাম’ নিয়ে একই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা। নির্বাচনে বাবুনগরীর বিএনপি প্রার্থীকে সরাসরি সমর্থন। এবং নির্বাচনের পর বাবুনগরীর নেতৃত্বে সাত কওমি দলের নতুন সমন্বয়। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও একসঙ্গে রাখলে কওমি বলয়ে জামায়াতের একক প্রভাব ঠেকানোর সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক স্বার্থের স্পষ্ট মিল দেখা যায়।

 

বিএনপির লাভ কোথায়?

 

এই সমীকরণে বিএনপির সম্ভাব্য লাভ কয়েক স্তরে। প্রথমত, কওমি জনসমর্থনের ওপর জামায়াতের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ঠেকানো। জামায়াত নিজস্ব সাংগঠনিক ভোটের সঙ্গে যদি বড় কওমি নেটওয়ার্ককে স্থায়ীভাবে যুক্ত করতে পারে, তাহলে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে তার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

 

দ্বিতীয়ত, বিএনপি নিজে ইসলামপন্থী দল না হয়েও বাবুনগরী, জমিয়ত ও হেফাজতের মতো প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর কাছে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারে।

 

তৃতীয়ত, মওদুদীবিরোধী পুরোনো ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ককে রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে সক্রিয় রাখা জামায়াতের জন্য বিশেষভাবে অস্বস্তিকর। কারণ এতে জামায়াতকে বিএনপির সঙ্গে শুধু নির্বাচন বা নীতিগত প্রশ্নে প্রতিযোগিতা করতে হয় না। কওমি সমাজের ভেতরে নিজেদের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে হয়।

 

চতুর্থত, কওমি দলগুলো যদি একটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত না হয়ে বিএনপি, জামায়াত এবং স্বতন্ত্র কওমি বলয়ে বিভক্ত থাকে, তাহলে তাদের কোনো একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপির সামনে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও কমে। এই অর্থে ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ শব্দটির রাজনৈতিক যুক্তি আছে। তবে বিভাজনটি বিএনপি সৃষ্টি করেছে এর চেয়ে বেশি নির্ভুল কথা হলো, আগে থেকেই থাকা দেওবন্দি–মওদুদী মতপার্থক্য এবং কওমি দলগুলোর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে বিএনপি নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছে।

 

কিন্তু বাবুনগরী কি শুধুই বিএনপির ‘দাবার গুটি’?

 

মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর জামায়াত ও মওদুদীবিরোধিতা কেবল বিএনপির তৈরি করা অবস্থান নয়। এর শিকড় কওমি-দেওবন্দি আলেমসমাজের দীর্ঘদিনের ধর্মতাত্ত্বিক বিরোধে। ফলে তাঁকে নিছক বিএনপির নির্দেশে চলা ব্যক্তি হিসেবে চিত্রিত করা বাস্তবতাকে অতিসরল করে ফেলবে। বরং ঘটনাটিকে দুই পক্ষের স্বার্থের মিল হিসেবে দেখলে বেশি পরিষ্কার হয়।

 

বাবুনগর-তারেক বৈঠক

 

বাবুনগরী চান কওমি-দেওবন্দি আলেমি কর্তৃত্ব জামায়াতের রাজনৈতিক ছাতার নিচে না যাক। বিএনপি চায় জামায়াত যেন পুরো ইসলামপন্থী ও কওমি জনসমর্থনকে নিজের নেতৃত্বে একত্র করতে না পারে। দুই লক্ষ্য এক জায়গায় এসে মিলেছে। আর এই সম্পর্ক যে এখন কেবল নির্বাচনের আগের স্বার্থগত যোগাযোগে সীমাবদ্ধ নেই। তার সবচেয়ে বড় প্রতীক ৯ আগস্টের বাবুনগর মাদ্রাসার দৃশ্য, যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে উপস্থিত, পাশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সামনে মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং হেফাজতের আলেমসমাজ।

 

শেষ পর্যন্ত লড়াইটা জনসমর্থনের

 

বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতি এখন আর শুধু ‘জামায়াত বনাম অন্যরা’ সমীকরণে আটকে নেই। এর ভেতরে অন্তত তিনটি কেন্দ্র স্পষ্ট। জামায়াতকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ইসলাম, কওমি-দেওবন্দি স্বতন্ত্র বলয় এবং সেই কওমি বলয়ের একটি অংশের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সমঝোতা।

মামুনুল হক এখনো জামায়াত নেতৃত্বাধীন সমঝোতার সঙ্গে থাকার কথা বলছেন। বিপরীতে বাবুনগরীর নেতৃত্বে সাতটি কওমি দলকে আলাদা বোঝাপড়ায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। জুনায়েদ আল হাবিবের জমিয়ত ইতোমধ্যে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার পরীক্ষা দিয়েছে। আর বিএনপির পক্ষ থেকে এই পুরো বলয়ের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান স্থপতিদের মধ্যে দৃশ্যমানভাবে রয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ ও নজরুল ইসলাম খান।

তাই সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত কে কাকে জোটে নিল, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বিশাল কওমি মাদ্রাসা নেটওয়ার্কের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক মেরুকে বেশি শক্তিশালী করবে।

জামায়াত চাইছে কওমি দলগুলোর একটি অংশকে নিয়ে বৃহত্ত র ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ঐক্য ধরে রাখতে। বিপরীতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিস্থিতি হলো, কওমি বলয় যেন জামায়াতের একক নেতৃত্বে না যায় এবং তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সমঝোতায় থাকে।

সেই বৃহত্তর দাবার বোর্ডে মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীকে ‘গুটি’ বলার চেয়ে স্বতন্ত্র শক্তিকেন্দ্র বলাই সম্ভবত বেশি যথার্থ। তবে এটাও স্পষ্ট যে তাঁর জামায়াতবিরোধী অবস্থানকে ঘিরে যে রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হয়েছে, সেই পরিসরের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি বিএনপি। আর ৯ আগস্টের তারেক রহমান–বাবুনগরী সাক্ষাৎ সেই দীর্ঘদিনের সমীকরণকে এখন আরও প্রকাশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।