তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ফসল উৎপাদন নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম দুশ্চিন্তা।
বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত সেচ পাম্প চালাতে হচ্ছে, ফলে চাষাবাদের খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে দোকানপাট ও কলকারখানায় কাজ থমকে থাকছে। বিশেষ করে ওয়েল্ডিং, কাঠের কাজ, মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ, ফটোকপি ও প্রিন্টিংয়ের দোকান, সেলুন, রেস্তোরাঁ এবং দর্জির দোকানগুলোতে কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু জানান, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ায় আগে থেকেই উৎপাদন খরচ বেশি ছিল। বর্তমান সংকটে সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে খরচ প্রায় ২০ শতাংশের মতো বেড়েছে।
রাজশাহীর ব্যবসায়ী মো. সাগর বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে কম্পিউটার, অনলাইন লেনদেনসহ সব সরঞ্জাম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কেনাবেচা ও উৎপাদন থমকে গিয়ে লোকসান গুনতে হয়। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে চার্জ হতে না পেরে বাসাবাড়ি ও দোকানের আইপিএসগুলোও বন্ধ হয়ে পড়ছে।
রাজশাহীর পবা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, চারঘাট, বাঘা, গোদাগাড়ী, তানোর ও মোহনপুরের মতো কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। পবার কৃষক উজ্জ্বল আলী জানান, ঠিকসময়ে সেচ দিতে না পারলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।
একই অবস্থা নাটোরের পোল্ট্রি খামারগুলোতেও—সেখানে ফার্মের ফ্যান চালাতে অতিরিক্ত ডিজেল খরচ করে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। আবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের কিছু এলাকায় দিনে মাত্র ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
নওগাঁর ৭০০টিরও বেশি চালের কলসহ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক ও কৃষি যন্ত্রপাতির কারখানাগুলো বিদ্যুতের অভাবে ঠিকমতো চলতে পারছে না। সুলতানপুর এলাকার ঘোষ অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক দ্বিজেন ঘোষ জানান, জেনারেটর চালিয়ে মিল রাখতে গিয়ে ডিজেলের পেছনে প্রচুর খরচ হচ্ছে। এই খরচ সামলাতে কখনো কখনো কারখানা বন্ধও রাখতে হচ্ছে।
বিসিক শিল্প নগরীর এক রাইস মিলের ব্যবস্থাপক জানান, বিদ্যুৎ সংকটে তাদের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। আবার ধামইরহাটের ব্যবসায়ীরা জানান, বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে দোকানগুলোতে জেনারেটরের মাসিক ভাড়া ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করা হয়েছে।
নিয়ামতপুরের গভীর নলকূপ চালক ফিরোজ হোসেন জানান, পর্যাপ্ত বৃষ্টি না থাকায় আমন ধান ক্ষেতে সেচ দেওয়া জরুরি। কিন্তু যে সেচের কাজে দুই ঘণ্টা লাগত, লোডশেডিংয়ের কারণে এখন ৩-৪ ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন থাকলে ধান বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁয় দিনে ৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াট।
ঝিনাইদহে পরিস্থিতি আরও নাজুক, সেখানে দিনে গড়ে ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। আরাপপুর এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুর রহমান জানান, এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দেড়-দুই ঘণ্টা থাকে না। কাশিমপুর গ্রামের কৃষক মেহেদী হাসান জানান, বেশিরভাগ সেচ পাম্প বন্ধ রয়েছে। আর বিদ্যুৎ এলেও ভোল্টেজের ওঠানামার কারণে সেচ পাম্পের মোটর পুড়ে যাওয়ার ভয়ে থাকতে হয়।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন ঝিনাইদহ থেকে শাহজাহান নবীন)