Image description

একসময় দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল পাট। সোনালি আঁশের সেই গৌরব ফিরিয়ে আনতে পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে সরকার।

২০৩১ সালের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করা, পাটবীজে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং উচ্চমূল্যের পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পাট চাষের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জাগ দেওয়ার পানির সংকট। একই সঙ্গে উৎপাদনেও দেখা দিয়েছে ধারাবাহিক ওঠানামা।

পাট কাটার পর আঁশ ছাড়াতে পানিতে জাগ দিতে হয়।

কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল-বিল, পুকুর ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনের সময় পানি পাচ্ছেন না কৃষক। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, আঁশের মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

পাট উৎপাদনে প্রসিদ্ধ ফরিদপুরের সালথা ও চরভদ্রাসনসহ বিভিন্ন এলাকার কোথাও কোথাও জাগের পানির সংকট দেখা দিয়েছে। জাগ দিতে দেরি হলে আঁশের রং ও গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

রংপুরের কৃষক এমদাদুল হক বলেন, এখন অনেক খাল-বিলে পানি নেই। পাট পচানোর মতো জায়গা ও পানি না থাকায় কৃষকরা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

উৎপাদনেও স্থিতিশীলতা নেই : জাগের পানিসংকটের পাশাপাশি দেশে পাট উৎপাদনেও স্থায়ী প্রবৃদ্ধির ধারা তৈরি হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭.২৭৪ লাখ হেক্টর জমিতে পাট উৎপাদন হয়েছিল ৮৪.৩২৪ লাখ বেল। পরের অর্থবছর আবাদি জমি সামান্য বেড়ে ৭.২৯৯ লাখ হেক্টর হলেও উৎপাদন বেড়েছিল মাত্র ০.৩০ শতাংশ।

ফলন ছিল হেক্টরপ্রতি ১১.৫৯ বেল।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবাদি জমি প্রায় ০.৮৫ শতাংশ কমলেও ফলন বেড়ে ১৩.২৪ বেলে উন্নীত হয়। এতে উৎপাদন ১৩.২৯ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৯৫.৮১৫ লাখ বেলে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ওই বছর মূলত ফলন বৃদ্ধির কারণেই উৎপাদন বেড়েছিল।

তবে পরের বছরই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদি জমি ৬.৯২৮ শতাংশ এবং ফলন ১৩.২৪ থেকে কমে ১১.৩৫ বেলে নেমে যায়। ফলে উৎপাদন এক বছরে প্রায় ১৭.৯১ শতাংশ কমে ৭৮.৬৫২ লাখ বেলে দাঁড়ায়। 

২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন। আবাদি জমি ও ফলন কিছুটা বাড়ায় উৎপাদন ২.২০ শতাংশ বেড়ে ৮০.৩৮২ লাখ বেল হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ৭.০৮২ লাখ হেক্টর জমিতে ৮৫্র.২১৫ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ জন্য হেক্টরপ্রতি ফলন ধরা হয়েছে ১২.০৩ বেল।

জাগের পানির বিকল্প খুঁজছেন গবেষকরা : পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ মুনীর হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে পাটের অন্যতম প্রধান সমস্যা জাগ দেওয়া। জলাশয়গুলো মাছ চাষে চলে যাচ্ছে, খাল-নদী দখল ও ভরাট হচ্ছে। ফলে কৃষক পাট পচানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছেন না। এতে পাট চাষে তাঁদের আগ্রহ কমছে।

তিনি বলেন, পাট পচানোর বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। বর্তমানে কৃষক পাটকাঠিসহ পানিতে জাগ দেন। কিন্তু যন্ত্রের মাধ্যমে আঁশ ও পাটকাঠি আলাদা করে শুধু আঁশ পানিতে পচানোর প্রযুক্তি রয়েছে। ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারের মাধ্যমেও পাট পচানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

গবেষক ড. মুনীর হোসেন বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে নেমে পাট জাগ দেওয়ার মতো কাজে অনেক কৃষক আর আগ্রহী নন। এ পদ্ধতিতে পরিবেশও দূষিত হয়।

পাট গবেষণা আঞ্চলিক কেন্দ্র, রংপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. মো. মজিবর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, এবার রংপুরে বৃষ্টি হলেও অনেক খাল, ডোবা ও জলাশয় পূর্ণ না হওয়ায় পাট জাগ দিতে সমস্যা হয়েছে। পাটের দাম ভালো থাকলে কৃষক শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি তুলে জাগ দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, কাঁচা পাটের গাছ থেকে যন্ত্রের মাধ্যমে বাকল ছাড়িয়ে শুধু আঁশ জাগ দেওয়ার একটি পদ্ধতি রয়েছে। এতে কম পানি লাগে। তবে এ পদ্ধতিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ পাটকাঠি ভালো থাকে, বাকিগুলো ভেঙে যায়। ফলে বাণিজ্যিকভাবে এটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। শতভাগ পাটকাঠি ভালো রাখার উপায় বের করতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

মজিবর রহমান বলেন, ফরিদপুরকে পাটের রাজধানী বলা হয়। সেখানেও জাগ দেওয়ার পানির সংকট। অনেক কৃষক শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করে জাগ দিচ্ছেন।

পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের আরেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এস এম কামরুজ্জামান বলেন, বড় ড্রামে পানি নিয়ে সেখানেও পাট পচানো সম্ভব। এতে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং পরিবেশদূষণও কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

বাড়ছে পানিসংকট, কমছে আগ্রহ : কৃষিসংশ্লিষ্টদের মতে, জাগ দেওয়ার পানির সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময়ের পরিবর্তন, খাল-বিল ও ছোট নদী দখল-ভরাট, জলাশয়ের স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সংকট বাড়ছে।

পাট গবেষণা কেন্দ্র ফরিদপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. রিশাদ আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ফরিদপুর যেহেতু নিচু এলাকা, এ কারণে পানির সমস্যা অন্যান্য স্থানের চেয়ে কম। খাল খননের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান হতে পারে । এ ছাড়া অনুজীবের মাধ্যমে পাট পচানোর কাজ নিয়ে গবেষণা চলছে।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. বোরহান আহমেদ বলেন, পর্যাপ্ত পানির অভাব, অনিয়ন্ত্রিত পচন প্রক্রিয়া এবং পরিবেশদূষণএই তিনটি বিষয় বর্তমানে বাংলাদেশে পাট পচনের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত।

পাট জাগ দেওয়ার মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাব এবং খাল-বিল ও জলাশয়ের পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় পাট পচানোর প্রয়োজনীয় পানি সহজে পাওয়া যায় না। পানির অভাবে অনেক কৃষক পাট পচাতে পারেন না, আবার অনেকেই অল্প পানিতে বা একই পানি বারবার ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এতে নিম্নমানের আঁশ উৎপন্ন হয়, যা বাজারে পাটের মূল্য কমিয়ে দেয়।