একসময় পরীক্ষার খাতায় কয়েকটি বাড়তি নম্বরই বদলে দিত একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। ২৮ বা ২৯ নম্বর পেলে ৩৩-এ তুলে দেওয়া, উত্তর পুরোপুরি ঠিক না হলেও ‘কিছু নম্বর’ দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়া; কিংবা গ্রেডের ঘর পূরণ করতে কয়েক নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অলিখিত সংস্কৃতি ছিল দীর্ঘদিনের। ফল ভালো দেখানোর চাপ ছিল শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশাসন— সবখানেই। তাই বছরের শেষে প্রশ্নটা ছিল, কতজন পাস করল, কতজন জিপিএ-৫ পেল।
সময়ের সঙ্গে সে হিসাব বদলে গেছে। বদলে েগছে খাতা দেখার নীতিও। এখন পরীক্ষার্থী যতটুকু জানে, যতটুকু লিখেছে এবং যতটুকু নম্বর পাওয়ার যোগ্য— তাকে ততটুকুই দেওয়ার কথা বলছে শিক্ষা প্রশাসন। আর এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে। গত তিন বছরে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে প্রায় ২০ ভাগ। একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল কি এতদিন শুধু শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও যোগ্যতার প্রতিফলন ছিল, নাকি এর পেছনে সরকারের নীতি ও মূল্যায়ন পদ্ধতিরও বড় ভূমিকা ছিল?
শিক্ষা খাত ও শিক্ষা বোর্ডসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এবার ফলাফলের পরিবর্তন শুধু শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির কারণে নয়। দীর্ঘদিনের ‘উদার মূল্যায়ন’ থেকে সরে এসে বাস্তবভিত্তিক খাতা মূল্যায়নের নীতিও এর বড় কারণ। ২০২৪ সাল থেকেই মাঠপর্যায়ে বার্তা দেওয়া হয়— ভালো ফল দেখানোর জন্য অতিরিক্ত নম্বর নয়, শিক্ষার্থী যা পাওয়ার যোগ্য, তাকে সেটিই দিতে হবে। ফলে একসময় যে ফলাফল ছিল উল্লম্ফনের গল্প, এখন তা-ই হয়ে উঠেছে বাস্তবতার আয়না।
দেড় দশকে পাসের হারে বড় ওঠানামা
২০১০-২৬ সাল পর্যন্ত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করলে পাসের হারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। ২০১০ সালে গড় পাসের হার ছিল ৮২ ভাগের কিছু বেশি। এরপর কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে তা বাড়তে থাকে। ২০১৩ সালে পাসের হার দাঁড়ায় প্রায় ৮৯ শতাংশে, ২০১৪ সালে ৯১ শতাংশের বেশি এবং ২০১৬ সালে ৮৮ শতাংশের ওপরে।
২০১৩-১৬ সালকে অনেকেই পাবলিক পরীক্ষার ‘বাম্পার ফলের’ সময় হিসেবে দেখেন। ওই সময় এসএসসি ও এইচএসসিতে পাসের হার ছিল গড়ে ৮৮-৯৩ শতাংশের মধ্যে। একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও ছিল দেড় থেকে দুই লাখের ঘরে।
এরপর আবার চিত্র বদলায়। ২০১৭ সালে পাসের হার নেমে আসে প্রায় ৮০ শতাংশে। ২০১৮ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ২০, ২০১৯ সালে ৮২ দশমিক ৮০ এবং ২০২০ সালে ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০২১ সালে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে। ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এরপর আবার নিম্নমুখী প্রবণতা। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমানে গড় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে। ২০২৬ সালের ফলেও সে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
শিক্ষা বোর্ডসংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন। আগে পরীক্ষার্থী অল্পের জন্য যাতে ফেল না করে এবং পাসের হার যাতে অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়, সেজন্য কিছু ক্ষেত্রে নম্বর দেওয়ার উদার হওয়ার প্রবণতা ছিল। এখন সে জায়গায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সঠিক মূল্যায়নকে।
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলছেন, ‘বিগত সময় খাতা মূল্যায়নে কী হয়েছে, সেটা বলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে চাই না। তবে খাতা দেখায় কী হতো, তা সবাই জানে। আমাদের নীতি হলো— কারও প্রতি সহানূভূতি কিংবা কঠোরতা নয়, যার যতটুকু প্রাপ্য, ততটুকুই নম্বর দেওয়া। আমি নিশ্চিত করতে পারি, এবার ফলাফলে কারও প্রতি উদারতা, কারও প্রতি কঠোরতা ছিল না।’
জিপিএ-৫-এর দৌড়েও বড় ছেদ
পাসের হারের মতোই গত দেড় দশকে সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায়। ২০০১ সালে গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর প্রথম বছরে জিপিএ-৫ পেয়েছিল মাত্র ৭৬ জন। এরপর বছর পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যাটি বাড়তে থাকে। ২০১০ সালের পর তা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখে পৌঁছে যায়। ২০২১ সালে এসএসসি ও সমমানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি। পরের বছর, ২০২২ সালে, সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জনে। অর্থাৎ দুই দশকের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা বেড়েছিল কয়েক হাজার গুণ।
কিন্তু এরপর চিত্র উল্টো। ২০২৫ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজারে। চলতি বছর আরও কমে তা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজারের মতো। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে জিপিএ-৫ কমেছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৭০ জন। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
দীর্ঘদিন ধরে জিপিএ-৫-এর সংখ্যা ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য মাপার অন্যতম মানদণ্ড। কোন স্কুলে কতজন জিপিএ-৫ পেল, কোন বোর্ডে কতজন সর্বোচ্চ গ্রেড পেল— এসব দিয়েই অনেকটা বিচার করা হতো শিক্ষার মান। ফলে প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ভালো ফল করার চাপও বাড়তে থাকে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, জিপিএ-৫ বাড়লেই কি শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা বাড়ে? শিক্ষাবিদদের মতে, বাস্তবতা সবসময় তা বলে না। কারণ জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী পরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তো দূরের কথা, ভালো মানের কলেজেও প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। ফলে সর্বোচ্চ গ্রেডের সংখ্যা এবং শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতার মধ্যে ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন ছিল দীর্ঘদিনের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছেন, ফলাফলে সরকারের নীতির প্রভাব ছিল— এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কতজন পাস করল, কতজন জিপিএ-৫ পেল, সে সংখ্যা দিয়েই ভালো প্রতিষ্ঠান যাচাই করা হতো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক এমনকি প্রশাসনের মধ্যেও ভালো ফল দেখানোর চাপ ছিল। অথচ জিপিএ-৫ পেয়েও অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী ধাপে ভালো করতে পারেনি।
‘২৮ নম্বরকে ৩৩’ করার সংস্কৃতির অবসান
পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে খাতা মূল্যায়নের সেই পুরনো সংস্কৃতি। পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী ২৮ বা ২৯ নম্বর পেলে তাকে ৩৩ নম্বরে তুলে পাস করিয়ে দেওয়া, গ্রেড পরিবর্তনের জন্য কয়েক নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া; কিংবা পুরোপুরি সঠিক না হলেও উত্তরে কিছু নম্বর দেওয়ার প্রবণতা ছিল। এমনকি প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কহীন উত্তর লিখলেও নম্বর দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থী যেন অল্পের জন্য ফেল না করে এবং পাসের হার যাতে অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়। কিন্তু এর ফলে সনদে পাওয়া নম্বর আর শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতার মধ্যে একটি কৃত্রিম ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান প্রশাসন সে সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। পরীক্ষকদের বলা হচ্ছে, উদারতা কিংবা কঠোরতা— কোনোটিই নয়; উত্তরপত্রে শিক্ষার্থী যা লিখেছে, তার ভিত্তিতেই নম্বর দিতে হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু বললেন, এখন ফলাফলে সংখ্যাগত অর্জনের চেয়ে গুণগত মানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষকদের সঠিক নম্বর দেওয়ার নির্দেশনা ছিল।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল কবিরও মনে করেন, উদার বা কঠোর— কোনো একটি নীতিই অনুসরণ করা হয়নি; বরং বাস্তবধর্মী ও সঠিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়ার কারণেই গত তিন বছরের ফলাফলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে।
ফলের খাতা কি তাহলে নীতিরও আয়না?
২০১০ থেকে ২০২৬— এই দেড় দশকের ফলাফল যেন বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষার এক দীর্ঘ ওঠানামার গল্প। কখনো পাসের হার ৯০ শতাংশের ওপরে, কখনো তা নেমে এসেছে ৬০ শতাংশের ঘরে। কখনো জিপিএ-৫ পেয়েছে প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থী, আবার কয়েক বছরের ব্যবধানে সে সংখ্যা নেমে এসেছে এক লাখের সামান্য ওপরে।
এই পরিবর্তন শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা, প্রস্তুতি বা পড়াশোনার মানের পরিবর্তন দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন— মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ একই শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যায়নের নীতি বদলালে ফলাফলের চিত্রও বদলে যাচ্ছে।
দেড় দশক ধরে ভালো ফলের যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে সংখ্যাই হয়ে উঠেছিল সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। এখন সে সংখ্যার মোহ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতাকে মূল্যায়নের চেষ্টা চলছে।
