প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট উইকলি ব্লিটজের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী গতকাল একাধিক এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে দাবি করেছেন, আতাউর রহমান বিক্রমপুরী এবং তার দুই সহকারীকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা হত্যা করেছে।
সালাহ উদ্দিন শোয়েব আরও দাবি করেন, বিক্রমপুরী ২১২ জন হিন্দু নারীকে অপহরণ করেছেন। এছাড়াও তিনি মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের জিহাদি প্রশিক্ষণ দেন এবং পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন বলেও অভিযোগ করেছেন শোয়েব।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, বিক্রমপুরী নিহত হননি। গতকাল মধ্যরাতে বিক্রমপুরী দ্য ডিসেন্টকে জানান, “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার মৃত্যুর খবর। অনেকেই আমাকে কল করছেন। আমি জানি না কেন আমাকে নিয়ে এমন হাস্যকর খবর ছড়ানো হচ্ছে।”
এছাড়াও, গতকাল রাত ৭টা ৩২ মিনিটে শোয়েব বিক্রমপুরীর নিহত হওয়ার তথ্য দিলেও বিক্রমপুরী সাড়ে তিন ঘণ্টা পর রাত ১০টা ৪৪ মিনিটে এক ফেসবুক পোস্টে তার এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বলেন। এমনকি আজ সকাল ১০টায় তিনি তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে এক লাইভ ভিডিওতে কথা বলেন।
কীভাবে ছড়িয়েছে এ গুজব?
বিক্রমপুরী নিহত হওয়ার ভুয়া খবর প্রথমে ছড়িয়েছেন ইন্ডিয়ান-আমেরিকান লেখক শ্রী আইয়ার। তার প্রতিষ্ঠিত ভারতভিত্তিক ওয়েবসাইট PGurus.com-এর ফেসবুক পেজে ৬ আগস্ট এক ভিডিওতে শ্রী আইয়ার বলেন, “বাংলাদেশে এখন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা কাজ করছে। আমি আপনাদের অনেক দিন ধরেই বলছি যে ৪০০ জন হিন্দু কিশোরীকে অপহরণ করা হয়েছে এবং তারা কোথায় আছে বা তাদের কোথায় আটকে রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। সুখবর এই যে, আমাদের কাছে খবর আছে যে ২১২ জন মেয়েকে অপহরণকারী এক ব্যক্তি … তার সৃষ্টিকর্তার কাছে পৌঁছে গেছে (মারা গেছে)। সে মাদ্রাসায় জিহাদিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল এবং এই জিহাদিদের ভারতে হামলা করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।”
তিনি আরও দাবি করেন, “আতাউর রহমান বিক্রমপুরী আজ রাত (৬ আগস্ট) ৮টা ৩০ মিনিটের দিকে তার শেষ পরিণতি পেয়েছে। আমরা এও জানি যে তার দুই সহযোগীকেও নির্মূল করা হয়েছে।”
ভিডিওটি দেখুন এখানে।
এই ভিডিওর রেফারেন্স দিয়ে শোয়েব চৌধুরী গতকাল ৮ আগস্ট দুপুর ১২টায় বিক্রমপুরীর মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা বলেন।
এরপর সন্ধ্যা ৭টায় দ্বিতীয় পোস্টে আবারও তার মৃত্যুর খবর ছড়ান।
আজ আবার সকাল ১১টার পর আরেক এক্স পোস্টে শোয়েব বিক্রমপুরীর একটি লাইভ ভিডিও শেয়ার করে বলেন, “ফেসবুকে বিক্রমপুরীর লাইভ দেখার পর, আমি বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছি। সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘থার্ড-পার্টি এনকোডিং সফটওয়্যার বা শিডিউলিং টুল ব্যবহার করে আগে থেকে রেকর্ড করা কোনো ভিডিও ফেসবুকে লাইভ হিসেবে প্রচার করা সম্ভব।’
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘দর্শকদের সঙ্গে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য আগে থেকে রেকর্ড করা কোনো বিষয়বস্তু প্রচারের সময় সেটি যে প্রি-রেকর্ডেড (pre-recorded), তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত।’
যেহেতু @SreeIyer1 জি এবং তার প্ল্যাটফর্মের দীর্ঘদিনের প্রশ্নাতীত বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে, তাই আমি বিশ্বাস করি যে তারা কোনো অযাচাইকৃত বা ভুয়া তথ্য ছড়াবে না। আমি এই ঘটনার বিষয়ে PGurus-এর কাছ থেকে পরবর্তী তথ্যের জন্য অপেক্ষা করছি।”
২১২ হিন্দু নারী অপহরণের দাবিটি অপ্রমাণিত
সালাহ শোয়েব তার পোস্টে অভিযোগ করেন, বিক্রমপুরী ২১২ জন হিন্দু নারীকে অপহরণ করেছেন।
এছাড়াও, শ্রী আইয়ার ৪০০জন হিন্দু নারীর
দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে এই দাবির সপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সালাহ শোয়েব বা শ্রী আইয়ারও ২১২ জন হিন্দু নারীকে অপহরণের কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি।
আতাউর রহমান বিক্রমপুরী দ্য ডিসেন্টকে জানান, “আমার বিরুদ্ধে অপহরণের যে তথ্য ছড়ানো হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ ভুয়া।”
আগেও ভুল তথ্য ছড়িয়েছেন শোয়েব চৌধুরী
বিতর্কিত লেখক শোয়েব চৌধুরী এর আগেও একাধিকবার বাংলাদেশ এবং ইসলাম্পন্থীদের নিয়ে গুজব ছড়িয়েছেন।
আজ ৯ আগস্ট তিনি তার এক্স পোস্টে একটি এআই ভিডিও প্রচার করে নোয়াখালীর একটি মাদ্রাসা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের খবর ছড়ান।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাই এ দেখা যায়, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি।
গত ১ আগস্ট এক এক্স পোস্টে শোয়েব দাবি করেন, ‘‘ঢাকায় অত্যাধুনিক ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করা হয়েছে।’’
দ্য ডিসেন্টের যাচাই করে দেখেছে, এমন দাবি সত্য নয়। মূলত দুই মেট্রো স্টেশন থেকে আলাদা আলাদা ভাবে একটি শপিং ব্যাগে জর্দার কৌটা ও পান এবং অন্যটিকে একটি খালি বস্তা পাওয়া যায়।
সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরীও বিগত বছরগুলোতে আওয়ামীপন্থী ভুয়া খবর ছড়ানোর জন্য দুর্নাম কুড়িয়েছেন। ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলো তার প্রচারিত একাধিক ভুয়া খবর বিগত বছরগুলোতে খণ্ডন করেছেন। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে তোলা একটি ছবিকে ভিন্ন পরিচয়ে প্রচার করেছিলেন। এছাড়া ২০২৩ সালে ধারণ করা একটি জঙ্গিগোষ্ঠীর পুরোনো ভিডিও নতুন করে প্রচার করে দাবি করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া জঙ্গিরা প্রকাশ্যে জিহাদের আহ্বান জানাচ্ছে।
এছাড়াও পাকিস্তানে মাদ্রাসায় ছাত্র নির্যাতনের একটি ভিডিওকে বাংলাদেশের ঘটনা হিসেবে প্রচার, সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশন ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে দাবি করে পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত হিন্দুদের বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার এবং হিন্দু মন্দিরে মুসলিম হামলার ঘটনা দাবি করে ভারতের প্রতিমা বিসর্জনের ভিডিও প্রচারের মতো একাধিক ঘটনায় তার দাবি পরবর্তীতে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।