ময়মনসিংহের ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করা আল আমিনের হাত কাটা একটি ছবি নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য দেওয়ার সময়ে তোলা ছবি এবং বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের পর বিজয় মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে আহত হওয়ার দাবি করলেও আন্দোলনের নেতা এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন ভিন্ন কথা। এ ছাড়া প্রশ্ন উঠেছে তার গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’ হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও।
আল আমিনের পরিচয়
আহত আল আমিন (৩৮) ময়মনসিংহ শহরের কোতোয়ালি থানার সানকিপাড়া শেষমোড় এলাকার বাসিন্দা মো. ইউসুফ মিয়ার ছেলে। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির অঙ্গসংগঠন তাঁতি দলের কোতোয়ালি থানা শাখার যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
যেভাবে আহত হন আল আমিন
ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানায় ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর একটি মামলা করেন আল আমিন। এতে ১৭ জনের নামসহ অজ্ঞাতনামা ১৫-২০ জনকে আসামি করেন তিনি। এতে ঘটনার সময় হিসেবে উল্লেখ করেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া স্থানীয় একাধিক নেতা এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন সেদিন বিকেল সাড়ে ৫ টার মধ্যে বিজয় মিছিল শেষ করেছিলেন তারা।
বিজয় মিছিল সমাপ্তির সময়ের বিষয়ে একই কথা বলেছেন ‘জুলাই যোদ্ধা’ আল আমিনও। তিনি বলেন, ‘বিজয় মিছিল শেষে বিকেলে আমরা আড্ডা দিয়ে আমি বাড়ি ফিরছিলাম। এ সময় আমার সঙ্গে কেউ ছিল না। যখন ২৯নং ওয়ার্ডের তৎকালীন কমিশনার রোমানের অফিসের সামনে আসি তখন আমার ওপর হামলা করা হয়। ওনারা আবার জানতো যে আমি বিএনপি করি। আমারে অ্যাটাক করলে তখন আমি দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করি। আমার হাতে কিছুই ছিল না। তো আমি দৌঁড় দিতে গিয়ে স্লিপ খেয়ে পড়ে যাই। ওখানে রাস্তা ভাঙা ছিল। পড়ে যাওয়ার পর তলোয়ার রিয়ে এসে আমাকে এলোপাতাড়ি কোপানো শুরু করে। মাথায় ২৭টা সেলাই। বাম পায়ে কোপ দিছে, ডান হাতে কোপ দিয়ে হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন কইরা লাইছে।’
তবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া স্থানীয় অন্তত তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী এই প্রতিবেদকে জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাত আনুমানিক ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে সময়ে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের কলপা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। আল আমিন তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মিলে সেই গ্রামে হামলা করতে যান।
তবে ঘটনাস্থল কলপা এলাকা (২৯ নং ওয়ার্ড) আল আমিনের বাড়ি সানকিপাড়া শেষ মোড় (৪ নাম্বার ওয়ার্ড) হতে ২ কিলোমিটারের বেশি দূরে বলে জানা গেছে। ময়মনসিংহ শহরে যাওয়ার পথে ২৯ নং ওয়ার্ডের মানুষকে ৪নং ওয়ার্ডের ওপর দিয়ে যেতে হয়।
অর্থাৎ, জুলাই যোদ্ধা আল আমিনের বাড়ি থেকে আরও কয়েক কিলোমিটার দূরের গ্রামে ঘটনাটি ঘটেছে, যা তার বাড়ি ফেরার পথে নয়। ফলে বিজয় মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে হামলা হওয়ার দাবিটি সত্য নয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সুলতান মোহাম্মদ রোহান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিজয় মিছিল শেষ করে ৫-৬টি মোটরসাইকেলে স্থানীয় যুবদল নেতা আসাদুজ্জামান নবীন, আল আমিনসহ ৮ থেকে ১০ জন মিলে কলপা গ্রামে হামলা করতে যান।’
‘যুবদল নেতা নবীন এবং ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ২৯নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার রাশেদুজ্জামান রোমানের ভাই দুজনের মধ্যে ব্যবসার সূত্রে আগে থেকে শত্রুতা ছিল।’
‘ওয়ার্ড কমিশনার রাশেদুজ্জামান রোমান ময়মনসিংহ সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক। বিজয় মিছিল শেষে তারা সে এলাকায় হামলা, ভাঙচুর করতে গিয়েছিলেন।’
এ বিষয়ে সাবেক ছাত্রদল নেতা আসাদুজ্জামান নবীন বলেন, ‘এটা আমাদের পাশে আওয়ামী লীগ শাসিত ছোট্ট একটি এলাকা। অল্প বয়সি এক ছেলে সেখানে কমিশনার হইসে, যে জুলুম অত্যাচারের সঙ্গে এলাকা চালাতো। আসল কথা হলো আমাদের দলের ভিতরও অনেক বিরোধিতা আছে। কিন্তু ডাকাতি-টাকাতি অই যুগ নাই।’
তবে কমিশনারের ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ীক দ্বন্দ্ব এবং হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা তো আওয়ামী লীগ করছে, আমরা আওয়ামী লীগের ভয়ে চলছি এত বছর। অইখানে আমরা যেতে পারিনি কখনও। আমাদের ব্যবসা আছে এগুলা কাঠ-ব্যবসা, বাজার ব্যবসা, ইজারা ব্যবসা এগুলো। আমার তো নেতৃত্বস্থানীয় লোক, আমরাই তো থাকুম। এলাকার লোকজন গেলে আমাদের নামই হবে এরকমই স্বাভাবিক।’
এ বিষয়ে কথা হয় আল আমিনের প্রতিবেশী আকাশের (ছদ্মনাম) সঙ্গে, যিনি আন্দোলনরত বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের একজন নেতাও ছিলেন। নিরাপত্তার শঙ্কায় তিনি নিজের নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেন এশিয়া পোস্টের সঙ্গে। আওয়ামী লীগের কমিশনার (২৯ নং ওয়ার্ড) কার্যালয়ের সামনে আল আমিনকে যখন গ্রামবাসী এলোপাতাড়ি কোপাচ্ছিল তখন কয়েক গজ দূরত্বে থেকে পালিয়ে বেঁচে যান আকাশ। আল আমিনের কিছুটা সামনে তিনিও পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন। তবে পরিচিত একজন তাকে টেনে তুললেও আল আমিনকে ওঠানো সম্ভব হয়নি।
সে রাতের ঘটনার বিষয়ে আকাশ বলেন, ‘এলাকাভিত্তিক একটা ব্যাপার থাকে না? যে এলাকায় এক বাড়ি কিছু করলে আশপাশে ১০ বাড়ি বের হয়। এরমধ্যে কয়েকটি বাড়িঘর বা আওয়ামী লীগের অফিস ভাঙচুর করার পর মোটরসাইকেলসহ তাদের কয়েকজনকে আটকে ফেলে গ্রামবাসী। আটকে পড়ার পর উদ্ধার পেতে সানকিপাড়া গ্রামবাসীকে ফোন করে সহয়তা চান তাদের কয়েকজন। এরপর নবীন ভাইরে মারছে ওই কথা শুনে আমরা দৌড়াদৌড়ি করে ৮০ থেকে ১০০ জন লোকসহ সেখানে উদ্ধার করতে যাই।
তিনি আরও বলেন, এরমধ্যে তারা মসজিদে মাইকে ঘোষণা করা শুরু করে গ্রামে ডাকাত পড়ছে। এরমধ্যে সে এলাকায় মহিলা থেকে শুরু করে ছোটবাচ্চা সবাই রাস্তায় চলে এসেছে এবং আমাদের তিন দিক থেকে ঘিরে আমাদের ওপর আক্রমন শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমরা উল্টোদিকে দৌড়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করি।’
এলাকার রাস্তা সংস্কারের কার্যক্রমের পাশাপাশি সেদিন বিকেল থেকে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা অনেকটা পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। এরমধ্যে রাত প্রায় সাড়ে ৯টা থেকে ১০টা বেজে যায়। দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে আল আমিন এবং আকাশসহ কয়েকজন একটি নির্মাণাধীন ড্রেনের কিনারায় পড়ে যান। পড়ে যাওয়ার পরে তার সামনে থাকা পরিচিত কয়েকজন তাকে টেনে তুলে ফেলে। কিন্তু ঘটনার আকষ্মিকতায় আল আমিনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পা পিছলে ড্রেনে পড়ে যাওয়ার পর গ্রামবাসীরা তার ডান হাত, মাথা এবং শরীরের অন্যান্য অংশে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে।
তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিক উপায়ে চেষ্টা করেও ২৯নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার রাশেদুজ্জামান রোমানের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
জুলাইয়ে রাজপথে ছিলেন আল আমিন
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সৃষ্ট আলোচনা এবং অভিযোগের সূত্র ধরে আল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট।
তিনি বলেন, ‘আমি হাসপাতালে দুই মাস চিকিৎসা নিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর আমারে রিলিজ করে। আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম তখন এটা ভ্যারিফিকেশনের জন্য সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ময়মনসিংহে তদন্ত পাঠাইছে। তদন্তের ডকুমেন্ট সব দেখছে। দেখার পর আমার চিকিৎসা ফ্রি হইছে। কেবিনে ভিআইপি কেবিনে রাইখা পরে আমার চিকিৎসা হইছে।’
অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর ভিন্ন ঘটনায় আহত হয়েও ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে সরকারি গেজেটভুক্ত হওয়ার বিষয়ে তার বক্তব্য, রাজনৈতিক হামলার আহতদের পরেও সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম আছে।
তবে সরকারি গেজেট এ ধরনের নিয়মের কথা বলা হয়নি। সরকারের তরফ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যোদ্ধা ও শহীদ পরিচয় কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে সে বিষয়ে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে।
‘জুলাই যোদ্ধা’ অর্থ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা উক্ত সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের আক্রমণে আহত ছাত্র-জনতা। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ অর্থ ‘তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা উক্ত সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের আক্রমণে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি।’
আল আমিনকে চেনেন না আন্দোলনের সমন্বয়ক
অন্যদিকে, ময়মনসিংহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক গকুল সূত্রধর মানিক বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছি। আল আমিনকে কখনও আন্দোলনে দেখিনি। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আমাদের আন্দোলনে হামলা চালানো হয়। এদিন শিক্ষার্থী রেদোয়ান হোসেন সাগর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। আরও অনেকেই আহত হন। তখনও আল আমিন নামের কেউ আহত হয়নি। হঠাৎ করে জানা যায়, আল আমিন জুলাই যোদ্ধা।

আন্দোলনে ছবি ও ভিডিওর সত্যতা
তবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অভ্যুত্থানে ১৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের একাধিক ফুটেজ এবং ছবি দেখান আল আমিন। ছবিগুলোর মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে এসব ছবি এবং ভিডিও ৫ আগস্টের পূর্বে আন্দোলনের মধ্যে তোলা।
এই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আবিদ আজম ও ময়মনসিংহ প্রতিনিধি কামরুজ্জামান মিন্টু।