ভর্তি আইসিইউতে, হাতে হাতকড়া। এমন ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর মিলল জামিনও। মুক্ত হলেন বটে, তবে একেবারে পৃথিবী থেকেই। তিনি পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান খান মনির (৪৮)।
ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে দীর্ঘদিন ভর্তি ছিলেন তিনি। গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি ছিলেন তিনি। সেগুলোতে জামিন পেলেও আরেক মামলায় তাকে দেখানো হয় গ্রেপ্তার। স্বজনদের অভিযোগ, আইসিইউতে হাতকড়াসহ ছবি নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনা শুরু হলে সবশেষ মামলায় মনিরকে জামিন দেওয়া হয়। সেই মুক্তি তিনি পেলেন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
মনিরের বাড়ি পটুয়াখালী সদরের বহালগাছিয়া গ্রামে। তিনি ছিলেন সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জেলা যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও নিষিদ্ধ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য। এছাড়া বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ফেডারেশনের সহ-সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন ছিলেন দায়িত্বে।
পরিবার, পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চব্বিশের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন মনির। পরের বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টু রোড থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তার বিরুদ্ধে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের ঘটনায় ঢাকায় দুইটি ও পটুয়াখালী সদরে পাঁচটি মামলা ছিল। এসব মামলায় প্রায় ১০ মাস ঢাকা ও পটুয়াখালী কারাগারে বন্দি ছিলেন। পরে সব মামলায় জামিন পেলেও পটুয়াখালীতে আরেক মামলায় শোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে তাকে রাখা হয় কারাগারেই।
মনিরের স্ত্রী মোসাম্মদ সালমা জাহান পটুয়াখালী সদরের কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনিও স্বামীর সঙ্গে গ্রেপ্তারর হয়ে অনেকদিন কারাবন্দি ছিলেন।
সালমা জানান, গত ৯ জুন ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারেই স্ট্রোক করেন মনির। তাকে তখন পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেলে। অবস্থার অবনতি হলে ১৪ জুন ভর্তি করা হয় আইসিইউতে। দুইদিন পর দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট। প্রায় দুই মাস আইসিইউতে থাকার পর গতকাল বিকালে তিনি মারা যান।
সালমার ভাষ্য, সাতটি মামলায় মনির খানের বেশ কিছুদিন আগেই জামিন হয়। সবশেষ মামলাটির জামিন হয় গত ৩০ জুলাই। তখন তিনি আইসিইউতে ভর্তি।
‘হাতকড়া হাতে থাকার ছবি ভাইরাল হওয়ার পরে জামিন হলো। শেষ পর্যন্ত হাতকড়া খুললেও তাকে জীবিত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি’- বলছিলেন সালমা।
আজ বৃহস্পতিবার পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে মিজানুর রহমান মনিরকে- জানায় পরিবার।
অভিযুক্ত এমনকি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সঙ্গেও অমানবিক আচরণ করা যাবে না- এমন নির্দেশনা আছে বাংলাদেশের সংবিধানে।
সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ও কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে এমনকি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সঙ্গেও কোনো ধরনের নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অমর্যাদাকর আচরণ না করার নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশ প্রবিধানের ৩৩০ ধারাতেও বলা আছে- বন্দিদের হাতকড়া পরানো বা দড়ির ব্যবহার প্রায় ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ও অমর্যাদাকর।
তারপরেও অভিযুক্ত আসামিদের হাতকড়া, কোমরে দড়ি এমনকি ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে হাজির করানোর ঘটনায় বিভিন্ন সময় সমালোচিত হয়েছে পুলিশ।