Image description

জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ মাহবুব আলমকে স্টেজে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানালে মায়ের হাত ধরে স্টেজে ওঠেন জুলাই অভ্যুত্থানে দুই চোখের দৃষ্টি হারানো মাহবুব আলম। এসময় নিজের দৃষ্টিহীন জীবনের কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলেন, “এখন আমার নতুন পরিচয়... আমি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।” এসময় আবেগাপ্লুত হয়ে দৃষ্টিহীনতার থেকে মৃত্য শ্রেয় এমন কথাও বলেন এই জুলাই যোদ্ধা। পাশাপাশি বিভিন্ন দাবিও জানান তিনি।  

 

বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এসময় জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত পরিবারের সদস্যরাও তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।  

নিজের বর্তমান জীবনের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি মোহাম্মদ মাহবুব আলম। আমি একজন শিক্ষার্থী ছিলাম। মাস্টার্সের পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে ব্যবসা করতাম এবং টুকটাক ছবি তুলতাম। জুলাই আন্দোলনের সময় যখন বাংলাদেশের প্রয়োজনে আমাদের সবার দরকার হয়েছিল, তখন আমিও রাস্তায় নেমেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুলিশের গুলিতে আমি আমার দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলি। এখন আমার নতুন পরিচয়... আমি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।” 

তিনি বলেন, “এই রাষ্ট্রের পুলিশ আমাকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী করে দিয়েছে। তাই বর্তমান রাষ্ট্রের কাছে আমার একটাই আবেদন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আপনারা এখানে উপস্থিত আছেন। যারা আমার দুই চোখ কেড়ে নিয়েছে, তাদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করুন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ, যারা চোখ হারিয়েছি, তারা যেন ন্যায়বিচার পায়। একই ভাবে যারা শহীদ হয়েছেন, যারা মারা গেছেন, তারাও যেন সঠিক বিচার পান।” 

এসময় মাহবুব বলেন, “আমি প্রতিবন্ধী হওয়ার পাশাপাশি আমার পুরো পরিবারও যেন পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। কারণ আমি ছিলাম আমাদের পরিবারের একমাত্র ছেলে। পরিবারের সব দায়িত্ব আমার ওপরই ছিল। কিন্তু ফ্যাসিস্টরা শুধু আমাকে প্রতিবন্ধিই করেনি, আমার পুরো পরিবারকেও অসহায় করে দিয়েছে। আমাদের পরিবারের যে অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল, সেটি রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের মতো ভেঙে পড়েছে।” 

 

তিনি বলেন, “এই ঘটনার পরপরই আমার বাবার ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হয়েছে। আর আজ যে মানুষটি সবসময় আমার পাশে থাকেন, তিনি আমার মা। তিনি না থাকলে হয়তো আজ আমি এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলার শক্তিও পেতাম না। একজন মা-ই জানেন, তার সন্তানের কখন কী প্রয়োজন।” 

মাহবুব বলেন, “আজ দুই বছর ১৮ দিন আমি চোখে দেখতে পাই না। আমি সম্পূর্ণ অন্ধ। দুই বছর ১৮ দিন। আপনারা শুধু ১৮ মিনিট চোখ বন্ধ করে চিন্তা করুন, কীভাবে চলাফেরা করতে পারবেন। হঠাৎ করে দৃষ্টিশক্তি হারানোর যে বেদনা, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি যতই এখানে বক্তব্য দিই, যতই মন্ত্রীদের কাছে যাই, সুপারিশ করি— দেখতে না পারার আর্তনাদ এবং কষ্ট কেবল সেই মানুষই বুঝবে, যে দেখতে পায় না। আর হঠাৎ করে দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের জন্য জীবন আরও দুর্বিষহ।” 

তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “অনেক সময় মনে হয়, ১৮ জুলাই যেদিন আমি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলাম, সেদিন যদি আমি মারা যেতাম, তাহলে হয়তো আমার মাকে আজ এভাবে কাঁদতে হতো না। মায়ের চোখের পানি সন্তানের জন্য অনেক বড় অভিশাপ।” 

রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাহবুব আলম বলেন, “মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আমার মতো যারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েছেন, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টে প্রায় ১৯ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েছেন, আরও অনেকে এক বা দুই চোখে আহত হয়েছেন, অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন— আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, তাদের খোঁজ নিন। দেখুন, তারা কতটা দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। আসলে এই মানুষগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা পর্যন্ত করতে পারেন না।” 

তিনি বলেন, “বিশেষ করে যারা চোখ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই দেশে সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিয়েছেন, সিএমএইচ থেকেও চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু তাদের আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। হয়তো তারা আপনাদের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছেন না বলেই সেই চিকিৎসা পাচ্ছেন না। 

“আমি তাদের পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি, দয়া করে তাদের খোঁজ নিন এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। হয়তো অনেকেই পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন না, কিন্তু কিছুটা হলেও আলো ফিরে পেতে পারেন। ভবিষ্যতে হয়তো তারা অন্ধত্বের এই অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসতে পারবেন। একই ভাবে অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও খোঁজ নিন।” 

জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত গোলাম নাফিসের বাবা গোলাম রহমান বলেন, “২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফার্মগেটে পুলিশের গুলিতে আমার ছেলে গোলাম নাফিস শহীদ মর্যাদা লাভ করে। আপনারা যে রিকশার ছবিটি দেখছেন, মাথায় পতাকা বাঁধা... এই ছেলেটিই আমার ছেলে। আসলে শহীদ পরিবার ও আহত পরিবারের অনেক কষ্ট। আপনাদের কাছে আমি বিনীত অনুরোধ রাখবো, আমি একজন শহীদের বাবা হিসেবে চাই— সব রাজনৈতিক দল মিলেমিশে আমাদের একটি সুন্দর দেশ উপহার দিক। আমি শহীদের বাবা হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ করবো, আপনারা যদি এভাবে বিশৃঙ্খলা করেন, তাহলে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে?” 

জুলাই শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, “আজ শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে কিছু কথা বলতে চাই। প্রথমত, শহীদ পরিবার বিচারের দাবিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল থেকেই আমরা রাজপথে নেমেছি। আজও পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়ার কোনও অগ্রগতি হয়নি। আজ এখানে যারা উপস্থিত আছেন, দল-মত নির্বিশেষে আমি সবাইকে বলতে চাই আমাদের ছেলেরা যেভাবে রক্ত দিয়ে দেশ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল, সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা দিতে হবে।” 

তিনি বলেন, “যাদের চোখ নেই, হাত নেই, পা নেই— যারা জ্বালা, যন্ত্রণা ও ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছেন, তারা একটি কথাই বলেন, ‘আঙ্কেল, আপনার ছেলে চলে গেছে। কিন্তু আমরা দুনিয়াতে থেকেও মনে করি, আমরা যেন সংসারের কাছ থেকে দূরে চলে গেছি।’ তারা অনেক কষ্টে আছেন। আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ রাখবো, আহত জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান করুন, শহীদ পরিবারকে সম্মান করুন। তাদের খোঁজ নিন। যারা অসহায় আছেন, যারা এখনো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত আছেন, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। এটি আপনাদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ আমরা সর্বস্ব হারিয়েছি। এর থেকে হারানোর আর কিছু নেই। এখন আমরা নিজেরাই হেরে যেতে চাই না। আমরা যদি বিচার না পাই, আপনারা যদি আমাদের এভাবে অবমূল্যায়ন করেন, অপমান করেন, তাহলে আমরা কার কাছে যাবো?” 

নিহত সাদাত হোসেন সজলের মা শাহিনা বেগম বলেন, “আমার একটি মাত্র সন্তান ছিল। আমার সন্তান দেশের জন্য সংগ্রাম করে জীবন দিয়ে গেছে। কিন্তু আমি সংগ্রাম করেছিলাম আমার সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। আমি আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে ক্লিনিং ডিপার্টমেন্টে কাজ করে আমার ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়িয়েছি। আমার ছেলে সিটি ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। আশুলিয়া থানার সামনে লাশবাহী ভ্যানে স্তূপ করে জীবন্ত অবস্থায় আমার সন্তানকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই কষ্ট আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি। আমার সন্তান ছিল ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা। কিন্তু আমি যখন তার লাশ বুঝে পাই, তখন সেটি সাড়ে ৪ ফুট থেকে ৫ ফুট ছিল। বাকি অংশ কোথায় গেলো? আপনারা অন্তত এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাবেন। এখানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আছেন, আমি এর উত্তর চাই।” 

নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে শাহিনা বলেন, “আজকে ইউএনও স্যার আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ আমার সন্তানের কবরের কাছে কেউ যায়নি। একটি ফুল দিয়ে যে তাকে বরণ করে নেবে, এমন আশা আমাদের পূরণ হয়নি। 

“আমি আমার সন্তানের চেহারাটুকুও দেখতে পারিনি। তাই বলে কি রাষ্ট্রের কাছে আমি এটুকু আশা করতে পারি না যে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কেউ আমার সন্তানের কবরের কাছে যাবে? কেউ দোয়া করবে? এই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমার ছেলের জন্য দোয়া করবে, জান্নাতবাসী হওয়ার দোয়া করবে? কিন্তু তারা বিভিন্ন জায়গায় দোয়া করছে। সাধারণ মানুষ মারা গেলেও তো সেভাবে দোয়া করা হয়। কিন্তু আমি তো একজন শহীদের জননী। আমি আমার সন্তানের মুখ দেখতে পারিনি। তাই বলে কি আমি রাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্মানটুকুও পাবো না?” 

জুলাই অভ্যুত্থানে সব নিহত-আহতদের মর্যাদা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সব শহীদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, সম্মান ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করবেন। দ্বিতীয়ত, যারা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী, তাদের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করবেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মাকে এভাবে সন্তান হারাতে না হয়। সেই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন, আমার সন্তানদের স্বীকৃতির জন্য। আরও বলব, আহত এবং শহীদ পরিবারের যেসব সদস্য কর্মক্ষম একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, তাদের পরিবার আজ অসহায় অবস্থায় আছে। তাদের খোঁজখবর নেবেন, নয়তো তাদের পুনর্বাসন করবেন। আমাদের সন্তানদের আত্মত্যাগের ইতিহাস দেশ ও বিশ্বের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন, যাতে আগামী প্রজন্ম তাদের ত্যাগের কথা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতে পারে।”