Image description

সারা দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো আবারও রাজনৈতিক সহিংসতায় উত্তপ্ত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ২ বছরের মধ্যে এমন উত্তাল অবস্থা দেখেনি ক্যাম্পাসগুলো। ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে ২ দিনেই আহত হয়েছে সাংবাদিকসহ অন্তত ৯৯ জন। গতকাল সোমবার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয় রক্তাক্ত সংঘর্ষের। যা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থেমেছে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে এসে। তবে এই উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রাজনীতি বিশ্লেষকদের।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্যারিস রোডে বিলবোর্ড থেকে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত কয়েকজনের ছবি নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। পরে তীব্র বিতর্ক, সমালোচনা ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে ছবিগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই ইস্যুতে সংঘর্ষ ঘটেছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ চলে প্রায় তিন ঘণ্টা। এতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস।

আগামীর সময়ের প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, এ ঘটনায় বেরোবিতে আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। ঘটনার প্রেক্ষাপট অভিন্ন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি নিয়ে আপত্তি তোলেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। যার মধ্যে সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবিও ছিল। তবে ছাত্রশিবির জানিয়ে দেয়, তারা কোনোভাবেই ওই ছবি অপসারণ করবে না। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে দুপক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়।

রাবির বিলবোর্ডেও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি প্রদর্শন করা হয়। এ নিয়ে আপত্তি জানায় বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। রাত পর্যন্ত আন্দোলন চলার পর তারা প্রক্টর কার্যালয়ে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে দুই উপ-উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনার পর প্রশাসন বিলবোর্ড থেকে বিতর্কিত ছবিগুলো সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রশাসনের আশ্বাসের পর আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেন। তবে এখানে কোনো সংঘর্ষ বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

সেই রেশ কাটেনি আজ মঙ্গলবারেও। সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাইয়ের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক সভায় অডিটরিয়ামে শিক্ষার্থীদের দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে ঢুকতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও জকসু-শিবিরের নেতাদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠান শেষে জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতাদের ওপর হামলা চালায় জবি শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এতে তিন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন।

দুপুর বারোটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে এই হামলার ঘটনা ঘটে। বেলা এগারোটার দিকে সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্ল্যাকার্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে দ্রুত হস্তান্তর ও বরাদ্দকৃত ২০ কোটি টাকা দিয়ে অস্থায়ী হল নির্মাণ ও মেডিকেল সেন্টারে পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা, টেকনিশিয়ান ও চিকিৎসক নিয়োগসংক্রান্ত দাবির কথা তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করার কথা বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। এসময় ইনকিলাব মঞ্চেরও কিছু সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন জকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস এবং জবি ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহিন মিয়া, সেক্রেটারি ফেরদৌস শেখ, জবি ছাত্র ফ্রন্টের ইভান তাহসিভসহ অনেকে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর দুপুর ১টার দিকে ঢাকা কলেজের ২ নম্বর গ্যালারিতে মুখোমুখি হয় ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল। দুই পক্ষের হামলার ঘটনায় শিবিরের অন্তত ২০ ও ছাত্রদলের ৭ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী কলেজের ২ নম্বর গ্যালারিতে জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল কলেজ শাখা ছাত্রশিবির। সেই প্রোগ্রামের ব্যানার টানানোর সময় অতর্কিত হামলা চালায় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

হামলায় শাখা ছাত্রশিবিরের অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেক আহত হয়েছেন। তাকে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নীলক্ষেতে শিবিরের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া দেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

সবশেষ আজ বিকাল ৪টার দিকে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন ছাত্রদলের দুই নেতা। ক্যাম্পাসের ভেতরে ন্যাশনাল মেডিকেলের সামনে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। আহতরা হলেন সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা শাখা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ (৩০) এবং লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বি (২৭)। বর্তমানে তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিকালে সানাউল্লাহ ও রাব্বি মাদ্রাসা ক্যাম্পাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় ৩০ থেকে ৪০ জন শিবির নেতাকর্মী রড, লাঠি ও ইটপাটকেল নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে দুজনেই রক্তাক্ত জখম হন। পরে ক্যাম্পাসের অন্য শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ধার করে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।

আরও পড়ুন