Image description

হাসপাতালের করিডর জুড়ে নীরবতা। রোগীর অপেক্ষায় থাকা শয্যাগুলো এক যুগ ধরে খালি। যেখানে নবজাতকের কান্না আর মায়ের চিকিৎসাসেবার ব্যস্ততা থাকার কথা ছিল, সেখানে জমেছে ধুলা, অবহেলা আর দীর্ঘ অপেক্ষা। যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিংগাড়ী গ্রামের ১০ শয্যার মা ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতাল নির্মাণ শেষ হয়েছে ২০১৪ সালেই। কিন্তু জনবল নিয়োগ না হওয়ায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার হাসপাতালটি চালু হয়নি আজও। ফলে ভৈরব নদবেষ্টিত চার ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে প্রয়োজনীয় মাতৃ ও শিশু চিকিৎসা থেকে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয়। প্রায় এক একর জমির ওপর ৫ কোটি ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৫ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। এতে রয়েছে আধুনিক দোতলা ভবন, চিকিৎসকদের আবাসন, নার্স কোয়ার্টার এবং ১০টি শয্যা। ২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় হাসপাতালের নির্মাণকাজ। আর শেষ হয় ২০১৪ সালের ৬ জানুয়ারি। একই বছরের ২০ মার্চ ভবনটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন ঠিকাদার। কিন্তু ভবন হস্তান্তরের পরই যেন থেমে যায় পুরো উদ্যোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, হাসপাতালটি নির্মাণের পর আর কোনো চিকিৎসক, নার্স কিংবা প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ভবনটি বন্ধ পড়ে আছে বছরের পর বছর। একসময় যে হাসপাতাল ঘিরে মানুষের স্বপ্ন ছিল, সেটি এখন অব্যবস্থাপনার প্রতীক।

হাসপাতালটি নির্মাণে স্থানীয় মানুষের অবদানও ছিল উল্লেখযোগ্য। সিংগাড়ী গ্রামের শেখ নাদের হোসেন, শেখ মুনতাজ হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক শেখ জমি দান করেছেন এক একর। তাদের প্রত্যাশা ছিল, এই হাসপাতাল এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার নতুন কেন্দ্র হবে। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পূরণ হয়নি সেই প্রত্যাশা।

শেখ মুনতাজ হোসেনের ছেলে মো. আমজাদ শেখের আক্ষেপ, ‘২০১৭ সালে যশোর থেকে একজন এবং নওয়াপাড়া সরকারি হাসপাতাল থেকে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসে হাসপাতালের তালা খুলে ভেতর ঘুরে দেখেছিলেন। এরপর আর কেউ নেননি খোঁজ। হাসপাতালটি যেভাবে ছিল, পড়ে আছে সেভাবেই।’

অভয়নগরের ভৈরব নদের চারটি ইউনিয়ন— শ্রীধরপুর, বাঘুটিয়া, শুভরাড়া ও সিদ্ধিপাশাকে উপজেলা সদর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। জরুরি চিকিৎসার জন্য এসব এলাকার মানুষকে নৌপথ কিংবা যেতে হয় দীর্ঘপথ ঘুরে। বিশেষ করে, প্রসূতি ও নবজাতকদের চিকিৎসায় সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল হাসপাতালটি নির্মাণের।

হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন হুইপ অধ্যক্ষ শেখ আব্দুল ওহাব। এক যুগেও চিকিৎসাসেবা চালু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি, ‘ভৈরবের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ নড়াইলের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার কথা বিবেচনা করেই হাসপাতালটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বারবার মন্ত্রণালয়ে তাগাদা দেওয়ার পরও চালু হচ্ছে না হাসপাতালটি।’

অবশ্য সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, হাসপাতাল পুরোপুরি পরিত্যক্ত নয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মা ও শিশু বিভাগের মেডিকেল কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের ভাষ্য, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রেহেনা পারভীন নামে একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক (এফডব্লিউভি) প্রতিদিন সেখানে যান। কোনো রোগী এলে তিনি দেখে প্রেসক্রিপশন দেন। তবে সেখানে কোনো ওষুধ নেই। অন্য কোনো স্টাফও নেই।’

পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে এটি কবে চালু হবে— এমন প্রশ্ন করা হয় যশোর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মো. দিলদার হোসেনকে। জবাবে তিনি বললেন, ‘লোকবলের অভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না হাসপাতালটি। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হলেই চালু করা হবে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি।’