Image description

দেশের উত্তরাঞ্চল বগুড়ায় শাহজালালের মতো একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সে লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এরই মধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সমীক্ষা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের কাছে প্রস্তাব (আরএফপি) চেয়েছে। তবে এমন উদ্যোগের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের ভাষ্য,  দেশের উত্তরাঞ্চলে আন্তর্জাতিক যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের চাহিদা এখনো এতটা নয় যে সেখানে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রয়োজন। বরং বিদ্যমান বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতাই পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

আওয়ামী লীগ শাসনামলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল বেবিচক। মুন্সীগঞ্জের আড়িয়ল বিলে জায়গা অধিগ্রহণ করতে গেলে স্থানীয় জনগণ এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। পরে নতুন জায়গা নির্ধারণ করা হলেও সে বিমানবন্দরের কাজ আর শুরু করা হয়নি।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান বাংলাদেশের সাবেক বোর্ড সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম আগামীর সময়কে বলেছেন, বগুড়ায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের কোনো অর্থনৈতিক ভিত্তি নেই। যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় সেখানে সর্বোচ্চ একটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হতে পারে।

বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেছেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের ঘোষণা সময়োপযোগী হয়নি। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব করতে চাইলে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ। তবে তিনি মনে করছেন, প্রতিরক্ষা কৌশলের দিক থেকে বগুড়ায় একটি শক্তিশালী বিমানঘাঁটির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দেশে এরই মধ্যে চারটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার। কক্সবাজার বর্তমানে ডমেস্টিক  এয়ারপোর্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে গত কয়েক বছরে তিনটি প্রকল্পে মোট ৬ হাজার  কোটি টাকার বেশি খরচ করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে দেশের দীর্ঘতম ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে, নতুন টার্মিনাল ভবনসহ অনেক কিছু। কিন্তু বারবার চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও কোনো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস এখন পর্যন্ত কক্সবাজার থেকে ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ দেখায়নি।

কক্সবাজার দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা হওয়া সত্ত্বেও ‘বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়’ বিবেচনায় কক্সবাজার থেকে কোনো আন্তর্জাতিক এয়ার‌লাইনস ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ দেখায়নি। আগ্রহ দেখায়নি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনাকারী দেশের একমাত্র বেসরকারি এয়ারলাইনস ইউএস-বাংলাও।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারির পর বেবিচকের অনুরোধে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কক্সবাজার থেকে শুধু একটি ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ দেখায়। তখন কক্সবাজার-ঢাকা-কলকাতা রুটে সপ্তাহে একটি ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়েছিল বিমান। কিন্তু পরে নানান অপ্রস্তুতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরবিষয়ক প্রজ্ঞাপন স্থগিত করা হলে সেটিও আর চালু হয়নি। এদিকে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম এবং সিলেটেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট খুব বেশি চলাচল করে না। অন্তর্বর্তী সরকার সিলেট থেকে আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট চালু করলেও পর্যাপ্ত রপ্তানি কার্গো না থাকায় পরে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

এমন বাস্তবতার মধ্যে বগুড়ায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে বেবিচক। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে বিপুল কৃষিজমি ও বসতবাড়ি অধিগ্রহণের আওতায় পড়তে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

বেবিচকের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. জাকারিয়া হোসেন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, তারা এরই মধ্যে সমীক্ষা প্রস্তাব দিতে বুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. ইকরামুল হক ও বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট্রের কাছে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) পাঠিয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আসার পর তা যাচাই-বাছাই করে যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

এই দুই প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাহজালালের মতো বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিকল্পনা ও নকশা তৈরির অভিজ্ঞতা এই দুই প্রতিষ্ঠানের নেই। ফলে শুরু থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে বেবিচক বলছে, বিকল্প ভাবনাও মাথায় রাখছে তারা। মো. জাকারিয়া হোসেন জানিয়েছেন, এই দুই প্রতিষ্ঠানের কারও প্রস্তাবই যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেবে তারা।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাত ঘিরে নেওয়া হচ্ছে একের পর এক পরিকল্পনা। এর অংশ হিসেবে গত মে মাসে ঘোষণা করা হয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আদলে নির্মাণ করা হবে বগুড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

বগুড়া এয়ারবেস পরিদর্শন শেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের পাশাপাশি ১০ হাজার ৫০০ ফুট দীর্ঘ রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ অবতরণ করতে পারে। একই সঙ্গে এই বিমানবন্দরে কার্গো ফ্যাসিলিটিও স্থাপন করা হবে, যা উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বগুড়ায় এভিয়েশন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক মানের এমআরও (মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল) কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেছেন, ঢাকার বাইরে আন্তর্জাতিক মানের এমআরও গড়ে উঠলে বিদেশি এয়ারলাইনসও সেখানে রক্ষণাবেক্ষণ সেবা নিতে আগ্রহী হতে পারে।

পুরনো স্বপ্ননতুন নামদেশে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের এমন উদ্যোগ নতুন নয়। এর আগে ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ২০১০ সালে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি সাতটি স্থান সরেজমিন পরিদর্শন করে তিনটি স্থানের নাম প্রস্তাব করে। এর মধ্যে দুটি স্থান ছিল ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর। পরে ওই তিনটি স্থান থেকে সরে আসে সরকার।

এরপর এ-সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের নভেম্বরে মুসীগঞ্জের আড়িয়ল বিলকে চূড়ান্ত করা হয়। তখন জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হলে এলাকাবাসী এর বিরোধিতা করে। ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি বিক্ষোভে গ্রামবাসী ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন ও কয়েকশ লোক আহত হন। এরপর তৎকালীন সরকার আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের প্রকল্পটি স্থগিত করে।

২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে আবার বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন করে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য জায়গা চিহ্নিত করার কাজ শুরু করে। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু পার হয়ে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলার সীমান্ত ঘেঁষে এ বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছিল তখন। এতে নতুন ব্যয় ধরা হয় ১ লাখ কোটি টাকা।

বিমানবন্দর প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ১৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন কোয়িকে। চার বছর সমীক্ষার পর মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের সীমান্ত ঘেঁষে উপযুক্ত স্থান বেছে নেয় তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরটি নির্মাণের কাজ আর শুরু করতে পারেনি বেবিচক। গচ্চা যায় দেশের শত কোটি টাকা।