একসময় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিল চীন। বাংলাদেশ সরকারের কাছে লিখিত প্রস্তাবও দিয়েছিল তারা। তখন বাধা ছিল ভূরাজনীতি। ভারত ছিল প্রকল্পটিতে চীনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও ভারতের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে দোটানায় ছিল। ফলে প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
এখন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। আওয়ামী লীগ সরকার নেই, ভারতের আপত্তিও আগের মতো দৃশ্যমান নয়। ফলে ধারণা করা হয়েছিল, এবার হয়তো চীনের অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ খুলবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এবার আগ্রহ কমে গেছে চীনেরই। আগে যে প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার
আলোচনা চলছিল, এখন সেখানে ঋণের প্রসঙ্গই গায়েব! বরং নতুন করে সম্ভাব্য সমীক্ষা দিয়ে পুরো প্রক্রিয়া আবার শুরু হচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে— চীন কি তিস্তা প্রকল্পকে আর আগের মতো অগ্রাধিকার দিচ্ছে না?
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছিল বাংলাদেশ। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চিঠি চালাচালিও হয়েছিল। এমনকি চীন চুক্তির একটি খসড়াও প্রস্তুত করতে শুরু করেছিল। কিন্তু এরপর সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।
এরপর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর ঘিরে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, অন্তত প্রস্তাবিত ঋণ নিয়ে কোনো অগ্রগতি হবে। কিন্তু সফর শেষে দেখা গেল, ঋণের বিষয়টি আলোচনায়ই আসেনি। বাংলাদেশ শুধু সহযোগিতা চেয়েছে আর চীনও সহযোগিতার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছে। অর্থায়নের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি বা সময়সূচি মেলেনি।
চীন সফর থেকে ফেরা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘আগের ঋণ প্রস্তাব নিয়ে এবার কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা সহযোগিতা চেয়েছি, তারাও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। সম্ভাব্য সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। সমীক্ষা ছাড়া চূড়ান্ত ডিপিপি করা সম্ভব নয়। ব্যয়ও সমীক্ষার মাধ্যমেই নির্ধারণ হবে।’
ইআরডির সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত ঋণ নিয়ে বর্তমানে কোনো অগ্রগতি নেই। এমনকি বিষয়টি এগিয়ে নিতে সরকারের পক্ষ থেকেও নতুন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ফলে ঋণ প্রস্তাবটি কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আগে যেখানে ঋণ প্রস্তাব একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছেছিল, সেখান থেকেই আলোচনা এগোলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় অনেক কম লাগত। কিন্তু এখন সম্ভাব্য সমীক্ষা দিয়ে গোড়া থেকে শুরু হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া এমনিতেই দীর্ঘ। এর সঙ্গে যদি নতুন করে সমীক্ষা, ডিপিপি ও অর্থায়নের আলোচনা যুক্ত হয়, তাহলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৬ মে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পের অর্থায়নের প্রস্তাব পাঠায়। পরে একই বছরের জুলাইয়ে ইআরডি চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার ঋণ চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের ব্যয় ধরা হয় ৭৫ কোটি ডলার, যার মধ্যে বাকি অর্থ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও অর্থায়নের অনিশ্চয়তায় সেটি এখন বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর গত ২ জুলাই ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছিলেন, বাংলাদেশ অনুরোধ করলেই তিস্তা প্রকল্পে আগের মতো সহযোগিতা করবে চীন। তবে তিনি প্রস্তাবিত ঋণ বা অর্থায়নের বিষয়ে একটি কথাও বলেননি। কূটনৈতিক মহলের মতে, এটিও চীনের অবস্থানের পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত হতে পারে। কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেছেন, ‘দশ বছর ধরে শুনছি তিস্তা মহাপরিকল্পনা হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেই। চীন-ভারতের কূটনীতি আমাদের বিষয় নয়। আমরা চাই তিস্তার ভাঙন থেকে মানুষ বাঁচুক, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন হোক।’
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) আজিম আহমেদের কাছে প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি জানতে চাওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার চিত্র বদলে যাওয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনায় রয়েছে ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, ১৭৩ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, চর উন্নয়ন, স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, কৃষিজমি উদ্ধার, নৌবন্দরসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ। কিন্তু এক দশক পরও প্রকল্পটি কাগজেই আটকে আছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও বাস্তব অগ্রগতি না হওয়ায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— তিস্তা মহাপরিকল্পনা কি আবারও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের বলি হতে যাচ্ছে, নাকি চীনের আগ্রহ কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ?