Image description

নতুন সরকার যখন দেশ পুনর্গঠনের নানামুখী চাপে ব্যস্ত, ঠিক তখনই নগরবাসীর কাঁধে চেপে বসছে ডেঙ্গুর পুরনো আতঙ্ক। বছরের পর বছর ধরে চলা এই চেনা ‘শত্রু’ এবার আরও ভয়াবহ রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে  গভীর শঙ্কা। গত ১০ বছরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১০ গুণ বাজেট বাড়িয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। যদিও এই বছরগুলোয় ডেঙ্গুতে মৃত্যুও বেড়েছে।

ঢাকার গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে সামনে আসে এক অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক চিত্র। মশা নিধনে দুই সিটির বাজেট প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফগিং মেশিন কেনা, আধুনিক কীটনাশক আমদানি এবং ড্রোনের পেছনে ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাজেট যত বেড়েছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও ঠিক ততটাই লাফিয়ে বেড়েছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বরাদ্দ ছিল ৬৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বাজেট। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ৫০ কোটি ৫০ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) বরাদ্দ ১৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অথচ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উত্তর সিটিতে এই বাজেটের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি এবং দক্ষিণে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে ২০১৫ সালের পর পাঁচ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে বাজেট বেড়েছে ৩ গুণের বেশি। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএনসিসির মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বাজেট ১৮২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ডিএসসিসিতে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ। দুই সিটিতে মোট বাজেট ২২৯ কোটি। যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ। এত খরচ, তারপরও মশা না কমায় উদ্বিগ্ন রাজধানীবাসী।

২০১৮ সাল পর্যন্ত কম বাজেট, কিন্তু কার্যকর মাঠপর্যায়ের কাজের কারণে মৃত্যু ছিল নামমাত্র বা শূন্য। অথচ ২০২৩-২০২৪ সালে মশকনিধনে দুই সিটির সম্মিলিত বাজেট শতকোটি টাকা ছাড়ায়, বিপরীতে ২০২৩ সালে রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জন এবং ২০২৪ সালেও বিপুল মানুষের প্রাণহানি ঘটে ডেঙ্গুতে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাজেট বাড়ানো বা লোকদেখানো আমদানি প্রযুক্তির ব্যবহার ডেঙ্গু দমনে ব্যর্থ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ আগামীর সময়কে বলছিলেন, এডিসের ধরন ভিন্ন। ফলে শুধু মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি দিয়ে এডিস কমানো সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ মশার চেয়ে লার্ভা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ এই বিশেষজ্ঞের।

ডেঙ্গু নিয়ে এবার তিন জরিপ: চলতি বছর ঢাকার দুই সিটির পক্ষ থেকে ডেঙ্গু-সম্পর্কিত দুটি জরিপ পরিচালনা হয়েছে। এর বাইরে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে হয়েছে আরেকটি জরিপ। এসব জরিপে ঢাকায় অন্য বছরের চেয়ে বেশি মাত্রায় এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্য বছর যেখানে ব্রুটো ইনডেক্স থাকে ১০, এ বছর সেটা ৩০-এর ওপরে। ব্রুটো ইনডেক্স দিয়ে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয়। সেই হিসেবে এ বছর ৩ গুণ বেড়েছে লার্ভার উপস্থিতি।

জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৭টিতেই মশার লার্ভার ব্রুটো ইনডেক্স গড়ে ২০-এর ওপরে পাওয়া গেছে। যা ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি এলাকার নালা-নর্দমা, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোল, বাড়ির বেজমেন্টে লার্ভার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

যে ম্যাজিকে ২৫ বছর আগে নিয়ন্ত্রণ হয়েছিল ঢাকার ডেঙ্গু: দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে। ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত এবং ৯৩ জনের মৃত্যু দেশের জনস্বাস্থ্যকে বড় ধাক্কা দেয়। এরপর নড়েচড়ে বসেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। তিনি জাপানি একটি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের সঙ্গে সিটি করপোরেশনকে যুক্ত করেন। এই চুক্তির আওতায় গবেষক ওয়াগাতসুমা ইউকিকোর নেতৃত্বে শতাধিক সদস্যের দল গঠন হয়। যার একজন ছিলেন কবিরুল বাশার। বর্তমানে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ। তিনি আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, ওই সময়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখার পেছনে মূল ম্যাজিকটি ছিল নিয়মিত ও সঠিক নিয়মে মশার লার্ভাসহ প্রজননস্থল ধ্বংস, ভাইরাস শনাক্তকরণ ও জরিপ। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে জাপানের এই চুক্তি দুই বছর চলমান ছিল। এরপর দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ২০১৯ সালে এসে পরিস্থিতি হঠাৎ ভয়াবহ রূপ নেয়। এর পর থেকে প্রতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে আরও বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মেলাতে ২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ হয়ে যায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুই সিটিতে। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে মশকনিধনে মোট ব্যয় হয় ৩২১ কোটি টাকা। আর বিভক্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত মশকনিধনে মোট ব্যয় করেছে হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে এই দীর্ঘ সময়ে মশক নিয়ন্ত্রণে ঢাকার নেই তেমন কোনো সফলতা। কিন্তু কেনো? ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী এডিসকে অভিজাত মশা উল্লেখ করে সাম্প্রতিক একটি কর্মসূচির সারসংক্ষেপ তুলে ধরলেন। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উপস্থিতিতে গুলশান, বনানী, মিরপুর এলাকায় তিন দিন মশকনিধন অভিযান হয়েছে। সেখানে ৬০ শতাংশ বাসাবাড়িতে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। যা বিপজ্জনক। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পুরনো দিনের কথা বলে লাভ নেই উল্লেখ করে তিনি জানালেন, জুনের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচির বিস্তারিত।

আর ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান জানালেন, ডেঙ্গু নিধনে দক্ষিণ সিটির ১০টি অঞ্চলে ১০টি কমিটি করা হয়েছে। যারা জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করবে। এ ছাড়া সপ্তাহ জুড়ে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করা হয়েছে ডেঙ্গু ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোয়। বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কর্মসূচির কথাও জানিয়েছেন।

তবে এত কিছুর পরেও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিটি করপোরেশনের কীটনাশক ছিটানোর ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গুমুক্ত হওয়া অসম্ভব। যতক্ষণ না সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ এডিস মশা ধ্বংস করা যাবে না। নিজ দায়িত্বে নগরবাসীকে ছাদবাগান ও আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনকে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে বলেও মত তাদের।