একজন স্কুল শিক্ষকের ফেসবুকে পোস্ট করা একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে ট্রোল, থানায় অভিযোগ, পুলিশি তদন্ত আর প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কমিটি গঠনের চিন্তা-ভাবনা সহ নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে গত কয়েকদিন ধরে।সবশেষ সোমবার (২৭ জুলাই) বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর পুরো ঘটনা ভিন্ন দিকে টার্ন নিয়েছে।
ঘটনার শুরু হয় গত বৃহস্পতিবার সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি পাল, ফেসবুকে একসময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ড 'ডিফারেন্ট টাচ'-এর 'শ্রাবণের মেঘগুলো' গানের সাথে একটি ভিডিও পোস্ট করার পর।
ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ওই একই গান ব্যবহার করে নিজেদের প্রোফাইলে ভিডিও পোস্ট করা শুরু করেন মিজ পালের প্রতি সমর্থনের অংশ হিসেবে।
ঘটনা একপর্যায়ে এতোটাই আলোড়ন তৈরি করে যে ওই ভিডিও পোস্ট করে বিউটি পাল 'সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি' লঙ্ঘন করেছেন কী-না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় সিলেটের প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।
কিন্তু সোমবার সিলেট সফরে গিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ আলোচিত ওই ভিডিওটি প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, তার জানামতে ওই ভিডিওতে 'অশ্লীলতা বা তেমন কিছু নেই।'
আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের পরই সিলেটের শিক্ষা বিভাগ ঘটনা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
সোমবার রাতে সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশাদ বলেন, প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যটা তো আপনি লক্ষ্য করেছেন, এরপর তো আর আমাদের কোনো কথা থাকে না।
ভিডিও ভাইরালসহ যা যা হলো:
ফেঞ্চুগঞ্জের পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি পাল ২৩শে জুলাই নিজের ফেসবুক পেইজে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। কয়েক সেকেন্ডের ওই রিল ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে শোনা যাচ্ছিল আশির দশকের বাংলা ব্যান্ড ডিফরেন্ট টাচের জনপ্রিয় গান 'শ্রাবণের মেঘগুলো'র একটি অংশ, আর গানের সঙ্গে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে শাড়ি পরে হাঁটছেন ওই শিক্ষিকা।
বিউটি পাল ভিডিওটি পোস্ট করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সমালোচনা ও ট্রোলের শিকার হন।
বিউটি পাল সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার পর তার সহকর্মী ও দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকেরা তার সাথে সংহতি জানাতে শুরু করেন। এর অংশ হিসেবে তারা ফেসবুকে নিজ নিজ প্রোফাইলে ভিডিও পোস্ট করতে থাকেন, নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা 'শ্রাবণের মেঘগুলো' গানের ওই নির্দিষ্ট অংশ, যেটি বিউটি পালের ভিডিওতে ছিল, সে অংশ ব্যবহার করে নানারকম ভিডিও দিতে থাকেন।
কেউ কেউ স্কুলের ভেতরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে ভিডিও দেন, কেউ স্কুলের বাইরে থাকা অবস্থায় করা ভিডিও পোস্ট করেন।
সব ভিডিওতে ব্যবহার করা হয় একই গান।
ভিডিও পোস্ট করা শিক্ষকেরা তাদের ভিডিওর ক্যাপশনে উল্লেখ করেন যে বিউটি পালের সাথে হওয়া সাইবার হয়রানির প্রতিবাদে তারা ভিডিও পোস্ট করছেন।
থানায় জিডি:
নিজের প্রোফাইলে প্রথম ভিডিও পোস্ট করার পরদিন শুক্রবার (২৪ জুলাই) ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়রি বা জিডি করেন বিউটি পাল।
ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, উনার একটি পোস্ট কেউ কেউ অতিরঞ্জিত করে প্রচার করছে এবং তার ফলে তিনি বিব্রত বোধ করছেন বিধায় তিনি অভিযোগ করেছেন। কে বা কারা এটি করেছে সেটি বের করার জন্য তিনি পুলিশের কাছে এই অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার নামে অভিযোগ করেননি।
এদিকে, পুলিশ বিউটি পালের অভিযোগের ভিত্তিতে 'আইটি ফরেনসিক' বিভাগের কাছে আবেদন পাঠিয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত করছে বলে জানান মি. রহমান।
প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের 'ইউটার্ন':
বিউটি পালের বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা আর প্রতিবাদী ভিডিওর মধ্যে আর সীমাবদ্ধ ছিল না। আলোচনা পৌঁছে যায় তার কর্মক্ষেত্রেও। তার পোস্ট করা ভিডিও নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার পর সিলেটের প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ চিন্তা করেছিল যে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি করবে তারা।
সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশাদ বলেন, আমরা চিন্তা করেছিলাম যে এটি (ভিডিওটি) সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নীতিমালা লঙ্ঘন করে কী-না, আমরা তা খতিয়ে দেখব।"
কিন্তু ঘটনার গতি পরিবর্তন হয়ে যায় রবিবার দুপুরের পর।
গতকাল সিলেট সফরে গিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করার পর মিজ পালের বিষয়টি আর খতিয়ে দেখা হবে না বলে জানান জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশাদ।
তিনি বলেন, মন্ত্রী যখন একটা স্টেটমেন্ট দিয়েছেন, তারপর তো আমাদের এ বিষয়ে করার কিছু নাই
কী বলেছিলেন গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী:
সোমবার সিলেটে সফরে গিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় বিউটি পালের পোস্ট ইস্যুতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়।
উত্তরে তিনি জানান যে বিউটি পালের পোস্টটি তিনি না দেখলেও তিনি শুনেছেন যে সেই পোস্টে 'অশ্লীল' কিছু নেই।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমার সোশ্যাল মিডিয়া নেই, কাজেই আমি ভিডিও দেখিনি। আমি আশেপাশে জিজ্ঞেস করে জানলাম, একজন একটা গান গেয়ে একটি ভিডিও করেছে এবং সেখানে অশ্লীলতা বা তেমন কিছু নেই। যদি না থাকে, গান গাওয়া অন্যায় এটা আর কেউ মানুক বা না মানুক, আমি মানতে রাজি না।