১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়েছেন দেশের ৬৩ বিশিষ্ট নাগরিক। তারা বলেছেন, গণরায়ের বাস্তবায়নে অনীহা রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের সম্ভাবনাকে বিপন্ন করবে এবং এতে রাজনৈতিক আস্থা ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিক সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক আহ্বান। সেই গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে একটি সুস্পষ্ট, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিবৃতিতে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পন্ন করার পরিবর্তে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দ্বিধার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান তাদের উদ্বিগ্ন করেছে।
স্বাক্ষরকারীরা বলেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেও গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে সাংবিধানিক রূপান্তরের একটি কার্যকর পথ নিশ্চিত করা জরুরি। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈধতা শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে না; জনগণের ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষা, গণআন্দোলনের শিক্ষা এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতিও এর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তারা সতর্ক করে বলেন, বর্তমান ক্রান্তিকালে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে অগণতান্ত্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। রাজনৈতিক শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং এমন পরিস্থিতি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সুবিধার বিষয় নয়; এটি জনগণের রাষ্ট্র পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই ঐতিহাসিক সুযোগকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ বা ক্ষমতার সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হলে জাতি একটি বিরল সম্ভাবনা হারাবে।
বিবৃতিতে তিন দফা দাবি
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন: জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে একটি স্বাধীন, কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনকারী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।
গণরায়ের প্রতি সম্মান: জনগণের প্রত্যাশা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া যাবে না। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকে রাষ্ট্রের বৈধতার প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের ধারাবাহিকতা: দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে।
বিবৃতিতে দেশের সর্বস্তরের জনগণ, বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় বিশ্বাসী নাগরিক ও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, এনপিএর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী, সিনিয়র অ্যাডভোকেট ড. শরীফ ভূঁইয়া, মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হেলাল মহিউদ্দীন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ নিজার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সমন্বয়ক মোস্তফা রিজওয়ান রাহাত, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর, সাংবাদিক সেলিম খানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী, মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠনের মোট ৬৩ জন প্রতিনিধি।