Image description

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের শেষদিনে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬' নামে নতুন একটি আইন পাস করেছে সরকার, যা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের সদস্যরা।

তাদের অভিযোগ, সংসদের নির্ধারিত কার্যতালিকায় না থাকার পরও গত ১৫ই জুলাই আইনের খসড়াটি অনেকটা আকস্মিকভাবে বিল আকারে উত্থাপন করা হয়। এরপর বিরোধীপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে 'তড়িঘড়ি করে' কণ্ঠ ভোটের মাধ্যমে সেটি পাস করানো হয়।

এমনকি, পাস হওয়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য এ ধরনের বিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানোর রীতি থাকলেও এক্ষেত্রে সেটি মানা হয়নি। ফলে আইনটি ঘিরে বিরোধীদলের সদস্যদের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

"অত্যন্ত তাড়াহুড়া করে আইনগুলো পাস করা হচ্ছে। এটার ভিতরে কী ভুল-ভ্রান্তি আছে, এটা তাড়াহুড়া করার কী হেতু? অন্য কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কি-না, সেগুলো আমরা বুঝছি না," সংসদে বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।

"কোনো সময় না দিয়ে এভাবে তাড়াহুড়া করে আপনারা যদি বিল পাস করার অনুমতি দেন, তাহলে আমি মনে করি, আমাদের যে মৌলিক অধিকার আইন প্রণেতা হিসেবে, সেটা আমাদের ক্ষুণ্ন হচ্ছে," যোগ করেন মি. রহমান।

সরকার অবশ্য বলছে যে, সময় স্বল্পতার কারণে সংসদ অধিবেশনের শেষদিনে তারা দ্রুততার সঙ্গে বিলটি পাস করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে বিরোধীদলের পক্ষ থেকে বিলটির বিষয়ে পরবর্তীতে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হলে সেটি বিবেচনা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

কিন্তু যে আইন পাস ঘিরে এত সন্দেহ ও বিতর্ক, কী আছে সেই 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইনে'? এটি কার্যকর হলে কারা ঠিক কী ধরনের সুবিধা পাবে? জামায়াত কেন এর বিরোধিতা করছে?
সংসদে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিলের বিপক্ষে ভোট দেন বিরোধীদলের সদস্যরাসেদিন সংসদে যা ঘটেছিল

গত ১৫ই জুলাই ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের শেষদিন।

ওইদিনের নিয়মিত কার্যতালিকায় নতুন আইন প্রণয়ন নিয়ে কিছু উল্লেখ ছিল না। পরবর্তীতে সম্পূরক আরেকটি কার্যতালিকা প্রকাশ করা হলে সেখানে ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিলের বিষয়টি সংসদ সদস্যদের নজরে আসে।

এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপনের প্রস্তাব করলে বিরোধীদলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়।

কারণ সাধারণত বিল উত্থাপনের তিন দিন আগে সংসদ সদস্যদের সবাইকে নোটিশ দিয়ে সেটির বিষয়ে অবগত করা হয়, যা এক্ষেত্রে মানা হয়নি বলে জানান বিরোধীদলের সদস্যরা।

তখন সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদকে জানান যে, নোটিশের সময়ের বিষয়টি তিনি মার্জনা করেছেন।

আইনের খসড়াটি মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছিল গত নয়ই জুলাই। এরপর ছয় দিন পার হওয়ার পরেও সরকার কেন সেটির বিষয়ে সংসদ সদস্যদের নোটিশ দিলো না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।

"ছয়টা দিন চলে গেলো। এর মধ্যে আমাদেরকে তিনদিনের যে নোটিশটা দেওয়ার কথা ছিল, ডকুমেন্টগুলো দেওয়ার কথা ছিল। দেওয়া হলো না কেন, তার কোনো জাস্টিফিকেশন কিন্তু পেলাম না," বলেন মি. রহমান।

এ অবস্থায় বিল উত্থাপনের পর ভালোমত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সেটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানোর আহ্বান জানান পাবনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের রীতি বাংলাদেশের সংসদে প্রথমদিকে ছিল না, বরং সপ্তম সংসদ অধিবেশন তথা ১৯৯৬ সালের পর শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানতিনি আরও বলেন, নতুন যে বিলটি উত্থাপন করা হচ্ছে, সেখানে নতুন করে আইন তৈরি করা হয়নি; বরং আগের বেশ কয়েকটি আইনকে একীভূত করা হয়েছে।

"বিলটার মধ্যে যদি জটিল কোনো বিষয় থাকত, আমি নিজেই প্রস্তাব করতাম যে, এটি স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করা হোক," সংসদে বলেন মি. আহমদ।

বিরোধীপক্ষের আপত্তি সত্ত্বেও এক পর্যায়ে বিলটি ভোটাভুটির জন্য সংসদে তোলা হয় এবং কণ্ঠভোটে সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে সেটি পাসও হয়ে যায়।

বিরোধীদলের পক্ষ থেকে কোনো সংশোধনীর সুপারিশ করা হলে পরবর্তীতে সেটি আমলে নেওয়া হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তখন জাতীয় নাগরিক পার্টি'র (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বেশ কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি থাকায় তিনি কিছু সংশোধনী দিতে চান। কিন্তু সেটা কীভাবে দেবেন- জানতে চান তিনি।

জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, মৌখিক বা লিখিতভাবে সংশোধনের বিষয়ে জানালে তারা সেটি বিবেচনা করে দেখবেন।

এদিকে, তড়িঘড়ি করে আইন পাসের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, "প্রথম অধিবেশনে বেশ কিছু আইন খুব তড়িঘড়ি করে পাস করতে হয়েছে সময়ের বাধ্যবাধকতার কারণে। সেই সময় আমরা বলেছিলাম, ভবিষ্যতে যেন সবকিছু আমাদের কাছে আমাদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী আসে।"

"এখানে শুধু অধিকারের প্রশ্ন নয়, এটা দায়িত্বেরও ব্যাপার। আমরা অধিকার না হয় স্যাক্রিফাইস করলাম, কিন্তু দায়িত্বে আমাদের অবহেলা হয়ে গেল," বলেন মি. রহমান।
জাতীয় নাগরিক পার্টি'র (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহহঠাৎ নতুন আইন কেন?

বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের এতদিন তিনটি আলাদা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করতে হতো।

সেগুলো হলো: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ।

এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন আইনে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এতে কাজ করার ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যেই এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের বিরোধ দেখা দিতো। এর ফলে প্রশাসনিক কাজে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ভোগান্তিতে পড়তেন।

এই সমস্যার সমাধানে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে সরকার একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা করেছে। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যই 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন ২০২৬' নামে নতুন আইনটি পাস করা হয়েছে।

এর আওতায় বিনিয়োগ বিষয়ক নতুন যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হবে, সেটি নাম 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ' হবে বলে আইন উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পাঞ্চল ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সকল কার্যক্রম এখন থেকে এই নতুন প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলবে বলে জানানো হয়েছে।
গত ১৫ই জুলাই ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের শেষদিনসেইসঙ্গে, নতুন আইনে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সংক্রান্ত সকল সেবা, অনুমোদন, লাইসেন্স, ছাড়পত্র, অনুমোদন প্রদানসহ ব্যবসায়ীদের আরও অনেক সমস্যা সমাধানে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার বিধানও রাখা হয়েছে।

ফলে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।

কোনো ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থে আইনটি প্রণয়ন করা হচ্ছে কি-না, বিরোধীদলের এমন প্রশ্নের জবাবে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কারো ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকার বিশেষ এই আইনটি প্রণয়ন করেনি, বরং বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থেই এটি করা হয়েছে।

নতুন আইন পাসের মাধ্যমে আগের চারটি আইন রহিত করা হয়েছে।

সেগুলো হলো: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, ২০১০; বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আইন, ২০১৫; বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৬ এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন, ২০১৮।

বিলুপ্তির পর বিডা, বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, নগদ অর্থ, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ, নথি, ঋণ, দায়, চুক্তি ও মামলা নতুন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরিত হবে।

তিন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী বলে গণ্য হবেন। চাকরির শর্ত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা আগের শর্তেই কর্মরত থাকবেন বলে নতুন আইন বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেনকেমন হবে কর্তৃপক্ষের কাঠামো?

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ' হবে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, যার প্রধান কার্যালয় থাকবে ঢাকায়।

তবে সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশের অন্য স্থানে শাখা কার্যালয় এবং বিদেশে লিয়াজোঁ কার্যালয় স্থাপন করা যাবে বলে আইনে বলা হয়েছে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য একজন চেয়ারম্যান এবং সাতজন সদস্য থাকবেন।

সরকার তাদেরকে নিয়োগ দিবে এবং পদমর্যাদা, চাকরির মেয়াদ, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য শর্ত সরকার নির্ধারণ করবে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান হবেন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী।

নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যোগ্য ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের আকৃষ্ট ও ধরে রাখার উপযোগী করে তাদের চাকরির শর্ত নির্ধারণ করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন এই বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা, বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রচার চালানো, বিনিয়োগের লক্ষ্যে প্রণোদনার প্রস্তাব অনুমোদন, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করবে।

সেইসঙ্গে, সরকারি শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি, স্থাপনা, শেয়ার ও স্বত্ব অধিকতর উপযোগী অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহার, হস্তান্তর, ইজারা বা কৌশলগত বিক্রয়ের বিষয়ে বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ সরকারকে পরামর্শ দিবে।

এছাড়া শিল্পাঞ্চলে বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পরামর্শক নিয়োগের শর্ত নির্ধারণ, তাদের কাজ করার অনুমতি ও ভিসার জন্য সুপারিশ প্রদান, বিনিয়োগ চুক্তির খসড়া তৈরিতে সরকারকে সহায়তা এবং শিল্পের তথ্যভাণ্ডার তৈরির দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত থাকবে বলে আইনে বলা হয়েছে।
নানামুখী সংকটে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বিদেশি ব্যবসায়ীরাবোর্ডে থাকবেন কারা?

আইনে বলা হয়েছে, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ পরিচালিত হবে একটি গভর্নিং বোর্ড বা পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে, যার সভাপতি হবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে বা তার মনোনীত ব্যক্তি।

আর সরকারের অর্থ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পররাষ্ট্র, আইন, ভূমি, শিল্প এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রিরা বোর্ডটিতে সদস্য হিসেবে থাকবেন।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও বেসরকারি খাতের চারজন প্রতিনিধিও বোর্ডে থাকবেন।

বেসরকারি খাতের ওই চার প্রতিনিধির মধ্যে দু'জন অবশ্যই নারী থাকতে হবে। বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান গভর্ননিং বোর্ডের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।

বিধি অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও রোডম্যাপ অনুমোদন, শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন, শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা, ভূমি বরাদ্দ, ইজারা প্রদান ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্রকল্পের সামগ্রিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে।

এ লক্ষ্যে বছরে তাদেরকে অন্তত দু'বার অবশ্যই বৈঠক করতে হবে।
সংসদে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমানক্ষমতা কতটুকু?

নতুন আইনে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ'কে দেশে বিনিয়োগ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা করবে।

এক্ষেত্রে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সময় সরকারি অনুমোদন, লাইসেন্স, ছাড়পত্রসহ অন্যান্য সেবা যাতে বিনিয়োগকারীরা ভোগান্তি ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট স্থানে পেতে পারেন, সেজন্য নতুন আইনে একটি 'সিঙ্গেল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম' প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে।

এক্ষেত্রে সেবা প্রদানকারী সকল প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে ওই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিধান রাখা হয়েছে। যদিও বর্তমানেও একটি 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস পোর্টাল' চালু আছে। তবে নতুন প্ল্যাটফর্মটি চালু হওয়ার পর আগের ওয়ান স্টপ সার্ভিস পোর্টালসহ অন্য সেবা প্ল্যাটফর্মগুলোকে সেটার সঙ্গে একীভূত করা হবে।

বেসরকারি শিল্প প্রকল্প নিবন্ধনের সময় বিদেশি ঋণ, সরকারি জমি বরাদ্দ, আমদানি করা যন্ত্রপাতি ছাড়, পরিবেশ ও অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র, ভিসা, কাজের অনুমতি এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিযোগাযোগ সেবা দেওয়ার সময়সীমা বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করতে পারবে।

আইন অনুযায়ী, এসব সেবা, নিবন্ধন, লাইসেন্স, অনুমোদন, ছাড়পত্র বা অনাপত্তিপত্রের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে।
বিনিয়োগ না হওয়ায় দেশে কর্মসংস্থাপনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না বলে বিশ্লেষকরা মনে করেনকোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা দপ্তর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ বা সুপারিশ দিতে পারবে। সেই নির্দেশ বা সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বাধ্য থাকবে।

নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো শিল্পাঞ্চল বা নিবন্ধিত শিল্প প্রকল্পের জন্য ভূমি প্রয়োজন হলে তা জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হবে এবং কর্তৃপক্ষ সেই জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে।

শিল্পাঞ্চলে ভূমি, ভবন বা জায়গা বরাদ্দ, ভাড়া বা ইজারা দেওয়া এবং ডেভেলপার ও অপারেটর নিয়োগের ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে।

আইন বা অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গ করলে নতুন কর্তৃপক্ষ ওই শিল্প প্রকল্পের নিবন্ধন, অনুমতিপত্র, ভূমি বরাদ্দ, ইজারা বা ভাড়া স্থগিত কিংবা বাতিল করতে পারবে।

সেইসঙ্গে, অব্যবহৃত বা পতিত সরকারি ভূমি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদনশীলখাতে ব্যবহার করতে পারবে।

একনেকে অনুমোদিত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইনে ভিন্ন কিছু না থাকলে পিপিপি প্রকল্পে বেসরকারি অংশীদারের প্রাক্-যোগ্যতা যাচাই, দরপত্র, দরকষাকষি এবং অনুমোদন সংক্রান্ত কাগজপত্র গোপন রাখার কথা বলা হয়েছে।

আদালতের আদেশ বা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি ছাড়া এসব তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশ করা যাবে না বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত নয়ই জুলাই 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬' এর চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভাবিনিয়োগ বাড়বে?

ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন পাসের ফলে দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার। আইনটি কার্যকর হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যহারে বাড়বে বলেও আশা করছেন কর্মকর্তারা।

"বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিনিয়োগকারীদের সহায়তা এবং নীতি-সমর্থনের ক্ষেত্রে বাস্তব প্রভাব রাখবে এমন উদ্যোগগুলোতে সরকারের সুস্পষ্ট মনোযোগের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ," আইন পাস হওয়ার পর এক বিবৃতিতে বলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বর্তমান নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।

তিনি একইসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষেরও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

মি. চৌধুরী বলছেন, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য যে ধরনের বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেটি বাংলাদেশে আনতে হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সত্যিকারের 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস' কাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

"দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি সমন্বিত বিনিয়োগ সংস্থার সুপারিশ করে আসছেন," বলেন মি. চৌধুরী।

বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলন (আঙ্কটাড) থেকেও বিডা, বেজা এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার।

"আমরা বিশ্বাস করি, ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিনিয়োগকারীদের আরো কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভ্যালু প্রপোজিশন আরো শক্তভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হবে," বিবৃতিতে বলে বিডা'র শীর্ষ কর্মকর্তা মি. চৌধুরী।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বর্তমান নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী
সরকারের নতুন উদ্যোগকে ব্যবসায়ীরাও সাধুবাদ জানিয়েছেন। যদিও আইনটি শেষপর্যন্ত কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, সেটি নিয়েও সন্দেহ পোষণ করছেন কেউ কেউ।

"এই সন্দেহটা আছে, কারণ এর আগের সরকারগুলোও বিভিন্ন সময় নানান আইন তৈরি করেছে, কিন্তু পরে সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের খুব একটা লাভ হয় নাই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচ্যাম) সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ এরশাদ আহমেদ।

তারপরও এ দফায় সরকার আইনটি বাস্তবায়ন করতে পারলে বিনিয়োগের প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই কমবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তারা পুরোপুরিভাবে চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না, কারণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতাই একমাত্র সমস্যা নয়।

"প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতার পাশাপাশি শিল্প-কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, কাস্টমস ও এনবিআরের হয়রানি, কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বন্দরে লম্বা সময় লেগে যাওয়া- এ ধরনের আরও অনেক সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে উৎসাহ হারাচ্ছে," বলছিলেন বিজিএমইএ'র সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।

এছাড়া নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বিনিয়োগে স্থবির অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

"কাজেই এসব সমস্যা সমাধানের দিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে। তা না হলে বেসরকারি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করা যাবে না," বিবিসি বাংলাকে বলেন অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাফিজুর রহমান।