Image description

বাস্তবায়ন পর্যায়ে দুর্নীতির শঙ্কায় আপাতত বাতিল করা হয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নদীভাঙন রোধ প্রকল্প প্রস্তাব। গতকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ নির্দেশ দেন।

একনেক সূত্র আরও জানিয়েছে, বৈঠকে প্রশ্ন ছিল— কীভাবে বোল্ডার তৈরি হয়, কতগুলো ফেলা হয়, এর হিসাব জানা যাবে কীভাবে? এসব বিষয় মনিটরিংয়ে একটি নীতিমালা তৈরিরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে সঙ্গে কমাতে বলা হয়েছে বাতিল করা প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ব্যয়।

সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলাধীন শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুনা এলাকা রক্ষা’সহ ৯টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। নদীভাঙন ছাড়া অন্য আটটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে অনুমোদন পাওয়া ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও নতুন কিছু বিষয় সংযোজন ও ডলারের দর বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে ব্যয় বেড়েছে ৫৪ শতাংশ।

পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার আগামীর সময়কে বলেছেন, নদীভাঙন রোধ প্রকল্পটি বাতিল না বলে বলতে হবে ফেরত দেওয়া হয়েছে। কারণ আবারও প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হবে; কিন্তু আপাতত হয়নি। এর কারণ হিসেবে তিনি জানালেন, প্রকল্পটি ৈতরি করা হয়েছে ২০২২ সালের রেট শিডিউল ধরে, ফলে এর অনেক ব্যয় প্রাক্কলন বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঠিক হয়নি। তবে ২০২৬ সালের নতুন রেট শিডিউল অনুমোদনের কাজ চলছে। আগামী ১০-১২ দিনের মধ্যে সেটি হয়ে গেলে এরপর প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘দুর্নীতির শঙ্কা বা অতিরিক্ত ব্যয় ধরার বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব না।’

একনেক ৈবঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী জানতে চান প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে কীভাবে মান নিশ্চিত করা হয় এবং পানিতে কতটি বোল্ডার ফেলে কতটির হিসাব দেওয়া হয়— এটি কীভাবে জানা যায়? জবাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভাষ্য ছিল, বোল্ডার তৈরির সময় বুয়েটের কমিটির মাধ্যমে টেস্ট করা হয়ে থাকে। তখন বৈঠক থেকে বলা হয়, বুয়েটে যে অংশের টেস্ট করা হয়, সেটুকু ভালোই থাকে। কিন্তু বাকি কাজ কীভাবে করা হয়, তা দেখতে হবে। সভায় বিদ্যুৎ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ‘আমার বাড়ি তো সিরাজগঞ্জে। আমি জানি, নানাদিক থেকে চাপ আসায় এখন পানি উন্নয়ন বোর্ড বোল্ডারের সংখ্যা কমায় না। কিন্তু কোয়ালিটি খারাপ করে বোল্ডার তৈরি করা হয়।

সভায় বিভিন্ন পক্ষ থেকে গুরুত্ব তুলে ধরে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তে অটল থাকেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অবশেষে প্রকল্পটি আপাতত বাতিল করা হয়েছে।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলাধীন শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকা রক্ষা প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৬৮৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। সম্পূর্ণ সরকারি তহবিলের অর্থে এটি বাস্তবায়নের কথা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো)। প্রকল্পের আওতায় নদীতীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভাঙনরোধ, উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন ও বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ করা হতো। এর মধ্য দিয়ে প্রকল্প এলাকার বন্যা ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ়করণ এবং পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হতো।

এদিকে একনেক ৈবঠকে অনুমোদন পেয়েছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব। চীনের অর্থায়নে নির্মাণাধীন এক্সপ্রেসওয়ের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর ব্যয় একলাফে ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। সে সঙ্গে বেড়েছে মেয়াদও। বৈঠকের পর ব্রিফিং করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, মূলত দুটি কারণে এ প্রকল্পের ব্যয় এত বেড়েছে। ‘একটি হচ্ছে, ডলার রেটে একটা বড় আকারে পরিবর্তন ঘটেছে। সেই ডলারের পরিবর্তনের কারণেই আবার কতগুলো ভ্যাট-ট্যাক্সসহ বেশ কিছু পরিবর্তনের জায়গা আছে। অন্য কারণটি হলো, এখানে নতুন একটা ইন্টারসেকশনের অঙ্গ সংযোজন হয়েছে। তো সেই অঙ্গ সংযোজনের ফলেও খরচের একটি বৃদ্ধি আছে।’ এ ছাড়া ‘আর কিছু ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, যেটা মূল ডিপিপিতে সেখানে ছিল না। পাশাপাশি আরও পাঁচটি নতুন অঙ্গ সংযোজন হয়েছে— যোগ করলেন প্রতিমন্ত্রী।

২০১৭ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯৪৯ কোটি। এখন এই সংশোধনীতে এসে ৯ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৩ লাখ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। এটিসহ একনেক ৈবঠকে ১৪ হাজার ৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট আটটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিলের ১০ হাজার ৪৯৪ কোটি ২১ লাখ এবং ৈবদেশিক ঋণ হচ্ছে ৩ হাজার ৫৫০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অনুমোদন পাওয়া অন্য প্রকল্পগুলো হলো— সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২, বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়) জেলা সমন্বিত উন্নয়ন এবং পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প। এ ছাড়া ‘দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন, ‘বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ এবং মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ (বেগমগঞ্জ-৫)’ ও দুটি ‘অনুসন্ধান কূপ (বেগমগঞ্জ-৬ ও সুনেত্র-২) খনন’ প্রকল্প। আরও আছে, ‘মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় বিদ্যমান কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং জেলা সদর হাসপাতালগুলোয় ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন প্রকল্প।