Image description

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নন-এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করলেও এখনো এসি বাসের ভাড়ার তালিকা নির্ধারণ করতে পারেনি। বিআরটিএ ভাড়ার এই তালিকা নির্ধারণ না করায় বাস কম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, একই রুটে নন-এসি বাসের তুলনায় কখনো দ্বিগুণ, কখনো তিন গুণ, আবার স্লিপার কোচে চার গুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হয়।

বিআরটিএ ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মধ্যে ১৯৯০ সালে দেশে গ্রীনলাইন প্রথম এসি বাস সার্ভিস চালু করে। তারপর ডলফিন, সোহাগ, ঈগল, হানিফসহ দেশের সব শীর্ষ বাস কম্পানি এসি বাস চালু করে। তবে সরকার গত ৩৮ বছরেও এসি বাসের জন্য কোনো সরকারি ভাড়ার তালিকা করতে পারেনি।

বাংলাদেশে আন্ত জেলা নন-এসি বাসের ভাড়া সরকার যাত্রীপ্রতি কিলোমিটারে দুই টাকা ২৩ পয়সা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এসি বাসের ক্ষেত্রে কোনো সরকারি হার নেই। ফলে একই দূরত্বে একেক কম্পানি একেক ভাড়া নিচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে নন-এসি বাসের ভাড়া ৭০৪ টাকা।

একই রুটে এসি বাসে সাধারণ সময়ে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা এবং ঈদের সময় এক হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটে নন-এসি বাসের ভাড়া ৯৫০ টাকা হলেও এসি বাসে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে স্লিপার কোচে ঈদের সময় জনপ্রতি তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আল হেলাল শুভ এসি বাস নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘ঢাকা থেকে রংপুর-ঠাকুরগাঁওয়ে সাধারণ সময়ে ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকায় এসি বাসে যাওয়া যায়। কিন্তু ঈদের সময় এসি বাসের ভাড়া হয়ে যায় তিন হাজার টাকা।

কোথাও কোনো নিয়ম নেই, ফলে বাস মালিক সমিতি নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করলেও করার কিছু থাকে না।’

যদিও বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এসি বাসের ভাড়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভারতে বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি পরিবহন সংস্থা বাসের ধরনভেদে ভাড়া নির্ধারণ করে। পশ্চিমবঙ্গ স্টেট রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের (ডাব্লিউবিএসআরটিসি) সর্বশেষ নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী সাধারণ বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া প্রায় ০.৯৫ ভারতীয় রুপি। একই প্রতিষ্ঠানের এসি বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১.৮০ রুপি। অর্থাৎ সাধারণ বাসের তুলনায় এসি বাসের ভাড়া ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ বেশি হলেও দ্বিগুণ নয়।

নেপালেও সরকার দূরত্বভিত্তিক বাসভাড়া নির্ধারণ করে। সর্বশেষ ভাড়া কাঠামো অনুযায়ী হিসাব করলে সাধারণ বাসে প্রতি কিলোমিটারে যাত্রীর ব্যয় গড়ে প্রায় দুই মার্কিন সেন্ট। উন্নতমানের বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে তা বেড়ে প্রায় তিন সেন্টের মধ্যে থাকে। এখানেও সরকার অনুমোদিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ নেই।

শ্রীলঙ্কায় জাতীয় পরিবহন কমিশন (এনটিসি) সাধারণ, সেমিলাক্সারি, লাক্সারি (এসি) ও সুপার লাক্সারি বাসের পৃথক ভাড়া নির্ধারণ করে। বিভিন্ন দূরত্বের সরকারি ভাড়ার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাধারণ বাসে প্রতি কিলোমিটারে যাত্রীর ব্যয় গড়ে প্রায় দুই মার্কিন সেন্ট। লাক্সারি বা এসি বাসে তা তিন সেন্ট। অর্থাৎ সাধারণ বাসের তুলনায় এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।

উদ্যোগ নিয়েও আবার থমকে গেছে বিআরটিএ : প্রথমবারের মতো এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়ে কিছু দূর কাজ এগোনোর পর আবার থমকে গেছে বিআরটিএ। গত ঈদুল আজহার আগে ভাড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নিয়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছিল।

গত ২৯ মার্চ সচিবালয়ে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, শুধু নন-এসি নয়, এসি বাসেরও ভাড়া নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এরপর ১৫ এপ্রিল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আব্দুস সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ঈদুল আজহার আগেই এসি বাসের ভাড়া চূড়ান্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

গত ২৬ এপ্রিল হওয়া প্রস্তুতি সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বিভিন্ন রুটের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়ার প্রস্তাব দিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকে বলা হয়। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে পরবর্তী বৈঠকে চূড়ান্ত ভাড়া নির্ধারণের কথা ছিল।

এ বিষয়ে বিআরটিএতে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেছেন, দেশে প্রায় ১২ ধরনের এসি বাস রয়েছে। প্রতিটির জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় আলাদা। তাই কস্ট অ্যানালিসিস করে ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে।

এরপর সে অনুযায়ী মালিক সমিতি চার ধরনের ভাড়ার প্রস্তাব দেয়। বিদেশে তৈরি (সিবিইউ) বাস, দেশে সংযোজিত (সিকেডি) বাস, ইকোনমি ক্লাস এবং স্লিপার বা স্যুইট ক্লাসের জন্য আলাদা ভাড়ার হার প্রস্তাব করা হয়।

অবশ্য সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, এটি শুধু একটি প্রস্তাব। চূড়ান্ত ভাড়া সরকারই নির্ধারণ করবে।

আইনের ফাঁকফোকরে সুযোগ পাচ্ছে মালিক সমিতি : সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩৪(১) ধারায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল বাসের ভাড়া নির্ধারণে সাধারণ বিধান প্রযোজ্য নয়। তবে একই ধারায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে সরকার বা বিআরটিএ যুক্তিসংগত ভাড়া নির্ধারণ করতে পারবে।

এই ধারার ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, এসি বাসের অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বহুদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। তাই আইন সংশোধন ছাড়াই সরকার ভাড়া নির্ধারণ করতে পারে। মালিকদের ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ দেওয়ায় তাঁরা নিজেদের সুবিধামতো বিভিন্ন শ্রেণি তৈরি করে ভাড়া প্রস্তাব করেছেন।

পরিবহন ও নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আদিলুর রহমান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা বিশ্বের অন্যতম মেগাসিটি, অথচ নগরীর ভেতরে চলার জন্য তেমন কোনো এসি বাস নেই। এসি বাসের সংখ্যা না বাড়লে ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশা কমানো সম্ভব নয়। কারণ ঢাকার গরম, অস্বস্তিকর আবহাওয়ায় সাধারণ বাসের ভিড়ে অনেকে চলতে চায় না, বিশেষ করে উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থা যদি শৃঙ্খলার মধ্যে আনা যায়, ভাড়া যদি স্বাভাবিকের মধ্যে আনা যায়, তাহলে বাস মালিকদেরও সুবিধা হবে। কিন্তু বাসভাড়া নিয়ে বিআরটিএ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। ফলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে গণপরিবহনে যুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে দুই পক্ষই।

অন্যদিকে ভাড়া নির্ধারণ কমিটির সঙ্গে যুক্ত বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, স্থায়ীভাবে ভাড়া নির্ধারণ করতে হলে আইন ও বিধিমালায় কিছু সংশোধন প্রয়োজন।

বিআরটিএর মুখপাত্র ও পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে বিআরটিএ ভাড়া নির্ধারণ করতে পারেনি। এ জন্য বর্তমানে একেক কম্পানি একেকভাবে ভাড়া নিচ্ছে। একটি সর্বনিম্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করা গেলে যাত্রী ও মালিক উভয়ের জন্যই তা উপকারী হবে। তবে কিভাবে এটা ঠিক করা হবে, সেটা সব অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে নির্ধারণ করা হবে।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এটা তো আসলে যাচ্ছেতাইভাবে চলছে। আমরা উদ্যোগ নিয়েছিলাম, ঈদের আগে একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। মাঝে একটু থমকে গিয়েছিল। এখন আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছি। এটা দ্রুতই ঠিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।