Image description

সরকারি বিধি বলছে, একজন অধ্যক্ষ ১০ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ বাড়ি ভাড়া পাবেন ৬ হাজার ৪৫০ টাকা। কিন্তু সে নিয়মের ধার ধরেননি রাজধানীর উত্তরখানের কাঁচকুড়া কলেজের অধ্যক্ষ মতলব হুসেন। তিনি প্রতি মাসে পকেটে ঢুকিয়েছেন প্রায় ৪১ হাজার টাকা— বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে টপকে গেছেন সরকারের একজন সচিবকেও! গভর্নিং বডির দেওয়া সর্বোচ্চ সীমাতেও তাকে রাখা যায়নি বেঁধে। তিনিসহ কলেজের তিন শিক্ষক মিলে শুধু তিন বছরে বাড়ি ভাড়া বাবদ হাতিয়েছেন ১১ লাখ টাকারও বেশি।

একই সঙ্গে অধ্যক্ষ মতলবের বিরুদ্ধে ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি এবং সনদহীন শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুতর জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক এক সরেজমিন তদন্তে। তদন্তে অংশ নেন ডিআইএ-এর দুইজন সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক এবং একজন অডিটরের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল।

নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, তিন শিক্ষকের অস্বাভাবিক বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ঘটনাকে আত্মসাৎ হিসেবে গণ্য করতে। শুধু তাই নয়, করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও। পাশাপাশি বলা হয়েছে, আত্মসাৎ করা টাকা কলেজের ফান্ডে জমা দিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ১০% বাড়ি ভাড়া পান (সরকারি অনুদানের অংশ হিসেবে)। তবে এই বাড়িভাড়া সর্বনিম্ন ১ হাজর টাকার কম হবে না। ২০২৫ সালে শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে সরকার বাড়ি ভাড়া ১৫ শতাংশে বর্ধিত করেছে। তবে কোনো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব তহবিল থেকে অতিরিক্ত বাড়ি ভাড়া বা অন্য ভাতা দিতে পারে। তবে এটি হতে হবে নিয়মের মধ্যে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিকে তা অনুমোদন করতে হবে এবং থাকতে হবে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কোনো সীমা উল্লেখ না থাকলেও সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়ি ভাড়ার চেয়ে বেশি যেন না হয়। অর্থাৎ বিভাগীয় শহর ও সাভার পৌরসভায় মূল বেতনের ৬০% এবং জেলা শহরে মূল বেতনের ৫৫%। একজন গ্রেড-১ পদমর্যাদার সচিব বাসা ভাড়া হিসেবে পান প্রায় ৩৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ, সচিবের চেয়ে বেশি বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন অধ্যক্ষ মতলব।

তদন্ত প্রতিবেদনে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অধ্যক্ষ মতলব হুসেনের বাড়ি ভাড়ার হিসাব আনা হয়েছে। বেতনের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিনি প্রতি মাসে বাড়িভাড়া বাবদ ৪০ হাজার ৮৪৫ টাকা নিয়েছেন। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী তাঁর বাড়িভাড়া পাওয়ার কথা ছিল মাত্র ১ হাজার টাকা। সেই হিসাবে সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করলে গত তিন বছরে তিনি নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত নিয়েছেন মোট ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪২০ টাকা। তবে গভর্নিং বডির (কমিটি) অনুমোদন হিসাব করলেও এই অনিয়মের সত্যতা মিলেছে। কমিটি সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ২৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়িভাড়া অনুমোদন দিলেও অধ্যক্ষ নিয়ম ভেঙে তারচেয়েও বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। কমিটির সেই অনুমোদনকে ভিত্তি ধরলেও গত তিন বছরে তার নেওয়া অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৪২ হাজার ৫০ টাকা।

আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলেজের অধ্যক্ষ মতলব হুসেন রাজধানীর অন্য একটি স্বনামধন্য কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে চাকরির অফার পান। শিক্ষার্থীরা তাকে রাখার জন্য দাবি জানালে গভর্নিং কমিটি তাকে রাখার জন্য ২০ হাজার টাকা বেতন বাড়ায়। সেই টাকা পরবর্তীতে বাড়ি ভাড়া হিসেবে দেখানো হয়। যা এখন অডিট আপত্তির মুখে পড়েছে।

একইভাবে অবসরে যাওয়া সহকারী অধ্যাপক সুধীর চন্দ্র দাস ১৩ হাজার ৮৩২ টাকা এবং গ্রন্থাগার বিষয়ের প্রভাষক মোস্তাফিজুর রহমান ৬০ হাজার ৭৭০ টাকা অতিরিক্ত বাড়ি ভাড়া হাতিয়ে নিয়েছেন। ডিআইএ এই অর্থকে ‘অবৈধ ও সাধারণ তহবিলে ফেরতযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে তা দ্রুত আদায়ের সুপারিশ করেছে।

কাঁচকুড়া কলেজের দুর্নীতির খতিয়ান শুধু এই বাড়ি ভাড়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অধ্যক্ষ বিভিন্ন কেনাকাটায় সরকারের ভ্যাট ট্যাক্স বাবদ ফাঁকি দিয়েছেন পৌনে ৪ লাখ টাকা। সনদহীন শিক্ষক নিয়োগ এবং একাডেমিক ও অবকাঠামোগত চরম বিপর্যয়ের চিত্রও পেয়েছে তদন্ত দল।

তদন্ত দলের দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলেজটির স্নাতক পর্যায়ে প্রভাষক (ব্যবস্থাপনা) পদে হাবিবা সুলতানাকে ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁর কোনো শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছিল না। তার নিয়োগকে অবৈধ ও বিধিসম্মত নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

কলেজের রেকর্ড অনুযায়ী, জমির পরিমাণ ১.৪৮ একর হলেও মাত্র ০.৩০২২ একর জমি কলেজের নামে নামজারি করা হয়েছে। তদন্ত দল শঙ্কা প্রকাশ করেছে, বাকি জমি এখনো নামজারি না করায় রয়েছে বেহাত হওয়ার ঝুঁকিতে।

একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগ এবং বিএসএস (সম্মান) শ্রেণিতে নেই প্রত্যাশিত শিক্ষার্থী। এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পরীক্ষায় স্নাতক (পাস) বিএ ও বিবিএস গ্রুপে কাম্য সংখ্যক শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী অংশ নেয়নি। সুসজ্জিত নয় ছাত্রীদের কমনরুম। সেখানে পর্যাপ্ত ওয়াশরুম, খেলার সামগ্রী বা প্রয়োজনীয় উপকরণের নেই কোনো ব্যবস্থা।

তদন্তে উঠে এসেছে, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে তৈরি করা হয় না কোনো কোর্স প্ল্যান বা দৈনন্দিন ক্লাসের লেসন প্ল্যান। নিয়মিত ক্লাস টেস্ট, অ্যাসাইনমেন্ট ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের কোনো বালাই নেই। কলেজের কোটি টাকার আসবাবপত্র ও মালামাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো ‘স্টক টেকিং কমিটি’ নেই। করা হয় না কোনো বার্ষিক স্টক টেকিং বা অডিট।

সার্বিক বিষয়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক প্রফেসর এম. এম সহিদুল ইসলাম বলেছেন, বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট বিধিমালা আছে। এর বাইরে বাড়ি ভাড়া নেওয়া সরাসরি আর্থিক অপরাধের শামিল। বিধিবহির্ভূতভাবে নেওয়া পুরো টাকা কলেজের তহবিলে ফেরত দিয়ে ব্যাংক জমার রশিদ ও বিবরণী দাখিলের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি, অবৈধ শিক্ষক নিয়োগ এবং জমি সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে ডিআইএ পরিচালক বলেছেন, ‘ভ্যাট ও ট্যাক্স ফাঁকি এবং নিবন্ধন বা সনদ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া গুরুতর জালিয়াতি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়াসহ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মতলব হুসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘শুধু বাড়ি ভাড়া নয়, বরং নগরভাতা, যাতায়াতসহ আরও কয়েকটি খাতে এই টাকাটা যোগ করা হয়েছিল। আমার অন্য একটি কলেজে চাকরি হয়, শিক্ষার্থীরা আমাকে রাখতে আন্দোলন করে। তখন গভর্নিং বডি আমাকে রাখতে ২০ হাজার টাকা বেতন বাড়ায়, যা নগরভাতা, যাতায়াত বিলসহ অন্যান্য খাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই সিদ্ধান্ত কমিটির অনুমোদনক্রমেই নেওয়া হয়েছিল।’

ডিআইএ-এর আপত্তির বিষয়ে তিনি বলেছেন, এই আপত্তিগুলোর বিপরীতে আমরা কমিটির রেজুলেশনসহ যাবতীয় প্রমাণ লিখিত জবাব হিসেবে জমা দেব।