১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পলাতক ছিলেন মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেন। দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ধরে তাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঘটনার পর প্রথম কয়েক বছর দেশে আত্মগোপনে থাকলেও পরে তিনি ভারতে চলে যান। সেখানে ছদ্মনাম ব্যবহার করে বসবাস করেন এবং বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে যাতায়াত করেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি নিয়মিত বাসস্থান ও পরিচয় পরিবর্তন করতেন।
ডিবি সূত্র জানায়, সম্প্রতি তাদের কাছে তথ্য আসে, মোজাফফর রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসায় অবস্থান করছেন। তবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য ছিল মাত্র দুটি—তার নাকের নিচে একটি বড় তিল রয়েছে এবং তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান এয়ারটেলে চাকরি করেন।
এই দুটি সূত্রকে ভিত্তি করে কয়েক মাস ধরে অনুসন্ধান চালায় ডিবির একটি বিশেষ দল। মেয়ের কর্মস্থল ও চলাচল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য বাসা শনাক্ত করা হয়। পরে ওই বাসার ওপর গোপনে নজরদারি চালিয়ে মোজাফফরের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন গোয়েন্দারা।
মোজাফফরের গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, ডিবির বিশ্বস্ত টিম জানতে পারে, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে তার মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করেন। জানা যায়, তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে (এয়ারটেল) চাকরি করেন। কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা একটি সম্ভাব্য বাড়ির ঠিকানা চিহ্নিত করেন। বাড়িটি চিহ্নিত করার পর ডিবি কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরে দূর থেকে লক্ষ্য রাখেন এবং ছদ্মবেশে সার্বিক পরিবেশ ও মোজাফফরের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। গোয়েন্দাদের কাছে মোজাফফরের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি ক্লু আগে থেকেই নথিবদ্ধ ছিল। তার নাকের ঠিক নিচে একটি আঁচিল বা তিল সদৃশ কালো দাগ রয়েছে। চেহারা পরিবর্তন করলেও এই জন্ম চিহ্নটি পরিবর্তনের সুযোগ তার ছিল না। অভিযানে যাওয়ার আগে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই চিহ্নটিকে তাদের প্রধান শনাক্তকরণ সূত্র হিসাবে নির্ধারণ করেন।
বুধবার গভীর রাতে গোয়েন্দা দল ছদ্মবেশে বাসার দরজায় কড়া নাড়ে। ভেতর থেকে দরজা খোলার পর অত্যন্ত নাটকীয় ও সুকৌশলে এগোয় পুরো প্রক্রিয়া। দরজা খেলার পর গোয়েন্দারা সরাসরি কোনো অভিযান বা গ্রেপ্তারবিষয়ক কোনো ভয়ভীতি না দেখিয়ে অতিথির মতো স্বাভাবিক আচরণ করেন। মেয়ের নাম ধরে জানতে চান অমুক (তার মেয়ে, যিনি এয়ারটেলে কাজ করেন) বাসায় আছেন কিনা। এ সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিজেদের ‘এয়ারটেল অফিস’ থেকে আসা কর্মী হিসাবে পরিচয় দেন।
তবে এত রাতে অফিসের লোক বাসায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই ঘরের ভেতর থেকে কৌতূহল ও কিছুটা সন্দেহ তৈরি হয়। এজন্য বাসার ভেতর থেকে একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি দরজা খুলে এগিয়ে এসে জানতে চান, ‘এত রাতে অফিসের কাজ কেন? আমাকে বলুন কী বিষয়। গোয়েন্দারা তখন কৌশলগতভাবে বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটির চেহারা পর্যবেক্ষণ করেন। বাড়ির অল্প আলোতেও কর্মকর্তাদের চোখ এড়ায়নি তার নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত তিল বা আঁচিলটি। এ সময় কর্মকর্তারা বলেন, ‘মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে? আমরা যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তার সঙ্গে দেখা করতে দিন।’ সরল বিশ্বাসে এবং কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই ব্যক্তি উত্তর দেন ‘আমি মোজাফফর। মেয়ের বাবা’। মুখ থেকে একথা শোনার পর আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেনি ডিবির চৌকশ দল। পলকের মধ্যে পকেট থেকে বের হয়ে আসে হ্যান্ডকাফ। অতঃপর মোজাফফরের দুই হাত বন্দি হয়ে যায় ডিবির শিকলে। চোখের পলকে দীর্ঘদিনের ছদ্মবেশী ও সুচতুর পলাতক আসামির হাতজোড়া অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আইনের খাঁচায়।