নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ‘অবৈধভাবে’ চলছে উবার-পাঠাও। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছ থেকে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে উবার ও পাঠাওয়ের পাওয়া নিবন্ধন সনদের (এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট) মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছর। ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর পাঠাওয়ের সনদের মেয়াদ শেষ হয়। আর পরদিন ৪ ডিসেম্বর শেষ হয় উবারের সনদের মেয়াদ। এরপর ছয় মাস হলো, সরকারের নীতিমালা লঙ্ঘন করে চলছে এ দুই প্রতিষ্ঠানের অধীনে গাড়িগুলো। যদিও সনদ পুনর্নিবন্ধনের আবেদন প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে বিআরটিএ।
নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারের এই কর্তৃপক্ষ এক বছরের জন্য এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট দিয়ে থাকে। প্রতিবছরই তা পুনর্নিবন্ধন করতে হয়। আর আবেদন করতে হবে মেয়াদ শেষের তিন মাস আগেই। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এতদিন ধরে নিবন্ধন ঝুলিয়ে রাখায় নিবন্ধন পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আবার নিবন্ধন ছাড়া উবার ও পাঠাওয়ের কার্যক্রম পরিচালনা চলমান থাকলেও আপত্তি তুলছে না সরকারের কোনো পক্ষ। বন্ধ করা হয়নি তাদের অ্যাপভিত্তিক সেবার কার্যক্রম।
বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে পরিবহন ব্যবসা শুরু করার জন্য নিবন্ধন নেয় উবার ও পাঠাও। এর পর থেকে নিয়মিত পুনর্নিবন্ধন করেই তারা রাইড শেয়ারিং চালিয়ে যাচ্ছে।
এই নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটি বিআরটিএর প্রকৌশল শাখা থেকে করা হয়ে থাকে। এই শাখার সহকারী পরিচালক নুরুল হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘পুনর্নিবন্ধনের আবেদন আমাদের কাছে আছে। তা নিয়ে কাজ চলছে। কিছু কাগজপত্র কমতি থাকায় সেগুলো আবার চেয়ে নিতে হয়েছে। তাই দেরি হয়েছে। নিবন্ধন দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। দ্রুত নিবন্ধন দিয়ে দেওয়া হবে।’
যদিও নিবন্ধনের আবেদন কবে করেছে— জানতে চাইলে তিনি জবাব দেননি। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো রাইড শেয়ারিং কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আবেদন যেহেতু করেছে, তাই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু আইন বলছে ভিন্ন কথা। ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা, ২০১৭’ অনুযায়ী, এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের রাইড শেয়ারিং কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই।
নীতিমালা অনুযায়ী, রাইড শেয়ারিং সেবা পরিচালনার আগে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে বিআরটিএ থেকে এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট নিতে হবে। এই সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান রাইড শেয়ারিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। রাইড শেয়ারিংয়ে ব্যবহৃত প্রতিটি মোটরযানের জন্যও আলাদা এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, শুধু প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হলেই হবে না; প্ল্যাটফর্মে যুক্ত প্রতিটি গাড়ি বা মোটরসাইকেলকেও বিআরটিএর এনলিস্টমেন্টের আওতায় আনতে হবে।
নীতিমালায় বলা হয়, বিআরটিএর নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই এবং অনুমোদনের পরই এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট ইস্যু করা হবে। এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেটের নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তা নবায়ন করতে হবে। নবায়নের জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে বিআরটিএর অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করতে হয় এবং যাচাই শেষে নবায়নকৃত সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়।
এসব বিষয়ে উবার ও পাঠাওয়ের কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। উবারের জনসংযোগ দেখে বেঞ্চমার্ক পিআর নামে একটি প্রতিষ্ঠান। কয়েক দিন চেষ্টা করেও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থা চালুর পর ঢাকায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে হু-হু করে। বিআরটিএর নিবন্ধিত মোটরযানের নথির তথ্য বলছে, প্রথম ৪৮ বছর, অর্থাৎ ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ছিল ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮১টি। অথচ পরবর্তী মাত্র সাড়ে ছয় বছরে, অর্থাৎ ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত আরও ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৬১৩টি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে।
অর্থাৎ, আগের পুরো সময়ের নিবন্ধনের প্রায় ৭৮ শতাংশের সমান মোটরসাইকেল যুক্ত হয়েছে মাত্র সাড়ে ছয় বছরে। বর্তমানে রাজধানীতে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের প্রায় ৪৪ শতাংশই ২০২০ সালের পর নিবন্ধিত হয়েছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, একটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানি সর্বোচ্চ কতগুলো গাড়ি তালিকাভুক্ত করতে পারবে, সেই সংখ্যা বিআরটিএর নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। সড়কের সক্ষমতার তুলনায় গাড়ি বেড়ে যাচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে আরও ভোগাবে।