টানা বৃষ্টিতে বগুড়ায় তৈরি হয়েছে এক নির্মম বৈপরীত্যের চিত্র। একদিকে পানিতে তলিয়ে পচে যাচ্ছে করলা, লাউ, কুমড়া, পাট ও আমনের বীজতলা; অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাবে কাঁচাবাজারে হু হু করে বাড়ছে সবজির দাম। ফলে একই দুর্যোগে দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন কৃষক ও ভোক্তা। মাঠে ফসল হারিয়ে দিশেহারা কৃষক, আর চড়া দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজি কিনে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের।
কৃষি বিভাগ বলছে, চলতি জুলাই মাসের টানা বৃষ্টিতে বগুড়ার ৪১৭ হেক্টর আবাদি জমি পানির নিচে চলে গেছে। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৯৬১ জন কৃষক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সবজি, পাট ও আমনের বীজতলা। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন আবারও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত প্রস্তুত করা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এখনই বৃষ্টি না থামলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বাজারের অস্থিরতা।
‘গত বছর কচু চাষ করে লাভ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতায় এবারও আবাদ করেছিলাম। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন জমিতে যা আছে, সেটাও নষ্ট হওয়ার পথে। সামনে কী করব বুঝতে পারছি না’
বগুড়া আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ১ থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৩০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ৯ জুলাই ১০৯ দশমিক ৮ মিলিমিটার এবং ১৩/১৪ জুলাই ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আগামী ১৭ জুলাই থেকে আবারও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ী দু'পক্ষেরই উদ্বেগ কাটছে না।

সরকারি প্রতিবেদনে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সারিয়াকান্দি উপজেলা। সেখানে ১৮৮ হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে চলে গেছে। কাহালুতে ৭৫ হেক্টর, দুপচাঁচিয়ায় ৫৫, আদমদীঘিতে ৪৫, সোনাতলায় ৩৮, শিবগঞ্জে ১৭ এবং শাজাহানপুরে ১৪ হেক্টর জমি নিমজ্জিত হয়েছে।
ফসলভিত্তিক ক্ষতির হিসাব বলছে, সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে আগামী মৌসুমের উৎপাদনের ওপর। ১২৬ হেক্টর আমনের বীজতলা, ১১৫ হেক্টর পাট, ১০৬ হেক্টর সবজি, ৩৪ হেক্টর আউশ, ২৩ হেক্টর মরিচ এবং ১৩ হেক্টর অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ফসলের ক্ষতি শুধু চলতি মৌসুমের নয়, সামনের মাসগুলোতেও উৎপাদন ও বাজারে এর প্রভাব থাকতে পারে।
সবজি চাষিদের অবস্থাই সবচেয়ে নাজুক। চলতি মৌসুমে জেলায় ৬ হাজার ৭৫১ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১০৬ হেক্টর খেত ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৭ জন সবজি চাষি।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে কাহালুতে সবচেয়ে বেশি ৪৫ হেক্টর সবজি খেত পানিতে ডুবে গেছে। সারিয়াকান্দিতে ২৮ হেক্টর, সোনাতলায় ১৩ হেক্টর, শিবগঞ্জে ১০ হেক্টর এবং আদমদীঘি ও শাজাহানপুরে ৫ হেক্টর করে সবজি খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘করলা চাষে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ করেছি। বিক্রি শুরু করার আগেই বৃষ্টি হলো। কয়েক দিনের মধ্যে পুরো ক্ষেত পানির নিচে চলে যায়। এখন সব গাছ পচে গেছে। এক টাকাও ঘরে তুলতে পারিনি’
তবে জমির পরিমাণের চেয়ে কৃষকের দুর্দশাই এখন বড় বাস্তবতা। সারিয়াকান্দিতে একাই ৭৫০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কাহালুতে ৪৯১ জন, দুপচাঁচিয়ায় ৪৭০, আদমদীঘিতে ৩৮৫, সোনাতলায় ৩২৪, শিবগঞ্জে ১০০ এবং শাজাহানপুরে ৯১ জন কৃষকের ফসল নষ্ট হয়েছে।

অনেক কৃষক জানান, এবার ভালো ফলনের আশায় ধারদেনা করে বীজ, সার ও কীটনাশক কিনেছিলেন। কিন্তু ফসল বাজারে তোলার আগেই জমিতে পানি জমে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ঋণ পরিশোধ নিয়েও তারা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
বগুড়া সদর উপজেলার শাখারিয়া দক্ষিণপাড়া গ্রামের করলা চাষি আমিরুল হোসেন বলেন, করলা চাষে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ করেছি। বিক্রি শুরু করার আগেই বৃষ্টি হলো। কয়েক দিনের মধ্যে পুরো ক্ষেত পানির নিচে চলে যায়। এখন সব গাছ পচে গেছে। এক টাকাও ঘরে তুলতে পারিনি।
একই গ্রামের কৃষক মাহফুজ ১৪ শতক জমিতে লাউ ও কুমড়া চাষ করেছিলেন। তিনি বলেন, বৃষ্টিতে মাচা ভেঙে গেছে। লাউ ও কুমড়ায় পচন ধরেছে। বাজারে নেওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই।
কালিবালা এলাকার কচুচাষি শামছুর রহমান বলেন, গত বছর কচু চাষ করে লাভ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতায় এবারও আবাদ করেছিলাম। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন জমিতে যা আছে, সেটাও নষ্ট হওয়ার পথে। সামনে কী করব বুঝতে পারছি না।
সব কৃষকদের দাবি, প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ক্ষতির পুরো চিত্র উঠে আসেনি। কারণ, এখনও অনেক জমিতে পানি জমে রয়েছে। পানি না নামলে ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণও সম্ভব হবে না।
এদিকে মাঠের এ ক্ষতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বগুড়ার কাঁচাবাজারে। উৎপাদন কমে যাওয়া, জমি থেকে সবজি তুলতে না পারা এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অধিকাংশ সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে কৃষক ফসল হারিয়ে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় সবজি কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
বগুড়া শহরের রাজাবাজার ও ফতেহ আলী বাজার ঘুরে দেখা যায়, কয়েক দিন আগেও ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া কাঁচা মরিচ এখন ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে বেগুনের দাম ৬০-৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০-১০০ টাকায় উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি লাফ দিয়েছে ঝিঙ্গা ও বরবটি। গত সপ্তাহে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া দুই সবজিই এখন ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ঢেঁড়স ২০ টাকা বেড়ে ৪০ টাকা, কচুর লতি ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা এবং পটল ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পিস লাউয়ের দাম ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকায় উঠেছে। শশা মানভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় সর্বোচ্চ ৪০ টাকা বেশি।
সবজির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় আরও কয়েকটি পণ্যের দামও বেড়েছে। পাকরি আলু ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ টাকা কেজি, আদা ১০০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং লেবু প্রতি হালি ১০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে রসুন ১২০ টাকা এবং গাজর ১৬০ টাকা কেজি দরে অপরিবর্তিত রয়েছে। কিছুটা স্বস্তি মিলেছে শুধু টমেটোর দামে। গত সপ্তাহে ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া টমেটো বর্তমানে ১৬০ টাকায় নেমে এসেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে দাম বাড়ার মূল কারণ সরবরাহ সংকট। টানা বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় জমিতে পানি জমে থাকায় কৃষক সবজি তুলতে পারছেন না। আবার যেসব এলাকায় ফসল রয়েছে, সেখান থেকেও পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় মোকামে পর্যাপ্ত পণ্য পৌঁছাচ্ছে না।
রাজাবাজারের সবজি বিক্রেতা শামিম হোসেন বলেন, মোকাম থেকে আগের মতো সবজি আসছে না। কৃষকরা ক্ষেতে ঢুকতে পারছেন না। অনেক সবজি পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। কম মাল আসায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
ফতেহ আলী বাজারের ব্যবসায়ী করিম হোসেন বলেন, দাম বাড়লেও ব্যবসায়ীদের লাভ বাড়েনি। বরং বাজারে ক্রেতা কমে গেছে। অনেকে প্রয়োজনের অর্ধেক সবজি কিনে চলে যাচ্ছেন। বিক্রি কমে যাওয়ায় দোকান খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাজার করতে আসা স্কুল শিক্ষক নাজমুল হোসেন বলেন, প্রতিদিন বাজারে এসে নতুন দামের মুখোমুখি হচ্ছি। আগে যে টাকা দিয়ে তিন-চার ধরনের সবজি কেনা যেত, এখন সেই টাকায় দুই ধরনের সবজিও পাওয়া যায় না। সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে গেছে।
ফতেহ আলী বাজার বহুমুখী সমবায় সমিতির নেতা লেলিন হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টিতে মাঠে ফসল নষ্ট হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। সে কারণেই অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা, কোথাও কোথাও তারও বেশি বেড়েছে। তবে মাছ ও মুরগির বাজার এখনো স্থিতিশীল রয়েছে।
এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না গেলেও সামনে কয়েক দিনের আবহাওয়াই নির্ধারণ করবে ক্ষতির চূড়ান্ত চিত্র। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, জেলায় শাকসবজির আবাদ হয়েছে ৬ হাজার ৭৫১ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ১০৬ হেক্টর ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন বৃষ্টি থেমে গেলে অনেক ক্ষেতেই নতুন করে উৎপাদনের সুযোগ থাকবে। কিন্তু আবার ভারী বর্ষণ হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ আজাহার আলীর মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় কৃষক ও ভোক্তাকে। কৃষক উৎপাদন হারিয়ে লোকসানে পড়েন, আর সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে সেই ক্ষতির চাপ গিয়ে পড়ে ভোক্তার পকেটে। বগুড়ার বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। এখন দ্রুত পানি নিষ্কাশন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ না নেওয়া হলে দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।