Image description

বাংলাদেশে পরিচালিত অনলাইন জুয়ার বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির দাবি, দেশে পরিচালিত বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপে প্রতিদিন এক হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হচ্ছে।

এই বিপুল অর্থ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সংগ্রহ করে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে চীনা নাগরিকদের পরিচালিত প্রায় ২০০টি পেমেন্ট কোম্পানি।

এমন তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে অনলাইন জুয়া চক্রের বাংলাদেশ অংশের মূলহোতাসহ ছয়জনকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করেছে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগ।

অভিযানে জব্দ করা হয়েছে ৬ হাজার ৬০০টি বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিম কার্ড, বিভিন্ন কোম্পানির আরও ৬৭টি সিম কার্ড, ৭০টির অধিক মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ ও একটি মাইক্রোবাস।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), মো. আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আব্দুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) এবং মশিউর রহমান তারেক (২০)।

ডিবি জানায়, সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে একাধিক অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করা হয়। এসব প্ল্যাটফর্মে লেনদেন পরিচালনার জন্য এমএফএস এজেন্ট ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হতো। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করার পর গাজীপুরের টঙ্গীর একটি রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতায় কুমিল্লা সদরের একটি হোটেল থেকে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তে ডিবি জানতে পেরেছে, অনলাইন জুয়ার লেনদেন পরিচালনায় ‘পে কাশমা’, ‘গোপে’, ‘লাকি পে’, ‘এলকিউ পে’, ‘এক্সই পে’ ও ‘কুল পে’-সহ একাধিক পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করছে। বাংলাদেশভিত্তিক জুয়ার সাইটে ব্যবহৃত এসব কোম্পানির অধিকাংশই চীনা নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

ডিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার অর্থ সংগ্রহে এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। দিন শেষে এসব অ্যাকাউন্টের অর্থ পারসোনাল অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স, বাইবিট ও বিটগেটের মাধ্যমে ইউএসডিটিতে (ক্রিপ্টো ডলার) রূপান্তর করা হয়। এরপর বিদেশে থাকা পেমেন্ট কোম্পানির নির্ধারিত ক্রিপ্টো ওয়ালেটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ডিবির প্রাথমিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশে পরিচালিত অনলাইন জুয়ার পেমেন্ট সিস্টেম নিয়ন্ত্রণে প্রায় ২০০টি পেমেন্ট কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। এর প্রতিটির দৈনিক লেনদেন কয়েক কোটি টাকা। ভালো অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলো প্রতিদিন এক লাখ ইউএসডিটিরও বেশি অর্থ বিদেশে পাচার করছে।

গ্রেপ্তার আরিফুল ইসলাম রিফাত ‘গোপে’ নামের একটি পেমেন্ট কোম্পানির হয়ে কাজ করতেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে এই কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালিত হতো। শুধু এই কোম্পানির দৈনিক লেনদেনই পাঁচ কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছে ডিবি। কোম্পানিটি চীনা নাগরিক নাথান ওরফে অ্যালিনের (ছদ্মনাম) নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। তিনি একসময় বাংলাদেশে অবস্থান করলেও বর্তমানে চীন থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে।

ডিবি আরও জানিয়েছে, পেমেন্ট কোম্পানিগুলো দৈনিক মোট লেনদেনের শূন্য দশমিক ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাংলাদেশি এজেন্টদের দিয়ে থাকে। এর অর্ধেক অর্থ এমএফএস অ্যাকাউন্ট সরবরাহকারী ভেন্ডরদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। কমিশনের অংশ পেয়ে থাকেন এজেন্ট, ডিএসও, সুপারভাইজার, হাউস ম্যানেজার, মালিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অনলাইন জুয়ার অর্থে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন চক্রটির মূলহোতা আরিফুল ইসলাম রিফাত। সম্প্রতি ৩০০ ফিট এলাকায় দুর্ঘটনায় পড়া একটি বিএমডব্লিউ গাড়ির মালিক তিনি। এছাড়া তার আরও একটি সাদা রঙের বিএমডব্লিউ গাড়ি রয়েছে। বিভিন্ন অভিজাত হোটেল ও রিসোর্টে অবস্থান পরিবর্তন করে তিনি দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলছিলেন।

ডিবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তি, সম্পদ এবং বিদেশি সংযোগ শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।