Image description

চট্টগ্রামের একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে মুখোশধারী ৪০ জন সন্ত্রাসীর তাণ্ডব ছিল শুধুই মাঠপর্যায়ের মহড়া। আসল নির্দেশ এসেছিল দেশের সীমানা পেরিয়ে সুদূর বিদেশ থেকে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে পুলিশ।

দুই কোটি টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায় দিনে-দুপুরে ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামের ওই প্রতিষ্ঠানে এই দুঃসাহসিক হামলা চালানো হয়। মাত্র কয়েক মিনিটের এই তাণ্ডবে অফিস ভাঙচুর, কর্মীদের জিম্মি এবং নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নেয় দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনায় নগরীর ব্যবসায়ী মহলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

মাঠপর্যায়ে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা হামলা চালালেও এর পেছনের মূল হোতারা বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়ছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘সোমবারের হামলায় জড়িতরা মূলত বিদেশ থেকে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সাথে যুক্ত।’

গোয়েন্দারা জানান, এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী কুখ্যাত পলাতক অপরাধী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে “বড় সাজ্জাদ”। বর্তমানে দুবাইয়ে আত্মগোপনে থেকে সে এই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে। মাঠ পর্যায়ে স্থানীয় অপরাধীদের দিয়ে এসব কাজ করাচ্ছে সে।

সিএমপি কমিশনার জানান, সাজ্জাদ বাহিনীর বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে এ ঘটনা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ মূল হোতারা বিদেশে নিরাপদে থাকলেও তাদের দেশীয় সহযোগীরা ঠিকই রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চলেছে।

তিন মিনিটের সেই হামলা

চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরা-বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোডের ‘মরিয়ম হাইটস’ ভবনে অবস্থিত ডিডিএন অফিসে ভাঙচুর চালাতে মুখোশধারী সশস্ত্র দলটির মাত্র তিন মিনিট সময় লেগেছিল। সোমবার দুপুর ১২টার ঠিক আগে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত প্রায় ৪০ জন লোক তৃতীয় তলার ওই অফিসে ঢুকে পড়ে।

মুহূর্তের মধ্যে তারা ১০টি ডেস্কটপ, ৪টি ল্যাপটপ, বায়োমেট্রিক মেশিন এবং কাচের দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর নগদ ৩৫ লাখ টাকা, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, চতুর্থ তলায় থাকা কোম্পানির মূল ডেটা সেন্টারটিতে তারা কোনো হাত দেয়নি।

দিনের আলোর এই হামলা কর্মীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হোসাইন আদিবা ফেরদৌস জানান, হামলাকারীরা কাচের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সবাইকে জোর করে বের করে দেয়। কেউ শারীরিকভাবে জখম না হলেও আতঙ্ক কাটছে না।

ফেরদৌস বলেন, ‘হামলার পর থেকে আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি।’

ঘটনার সময় অফিসের বাইরে চা খেতে যাওয়া অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আশিকুল ইসলাম ফিরে এসে দেখেন পুরো অফিস ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে কর্মীরা চান্দগাঁওয়ের এক কুখ্যাত অপরাধীর ছোট ভাইসহ বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করলেও, ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

হামলার আগে চাঁদার কল

এই সহিংসতার সূত্রপাত হয় গত ১১ জুলাই। ওই দিন ডিডিএন-এর মালিক আদিল বিন মামুনের হোয়াটসঅ্যাপে একটি কল আসে। ডেভিড ইমন পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি কুখ্যাত বড় সাজ্জাদ নেটওয়ার্কের নাম করে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে ‘প্রোটেকশন ফি’ বা চাঁদা দাবি করে।

একটি ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি ১৬-১৭ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। ব্যবসা চালাতে চাইলে টাকা দিতেই হবে, নইলে আমার ছেলেরা আপনার ব্যবসা চালাবে।’

এই ডেভিড ইমন নামে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি মোবারক হোসেন ইমন হিসেবে শনাক্ত করেছে পুলিশ।

মালিক মামুন এই হুমকি পাত্তা না দেওয়ায় সিন্ডিকেটটি প্রতিশোধ নেয়। হামলার সময় তারা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আরিফুল ইসলামের তিনটি মোবাইল, একটি প্রিন্টার এবং নগদ ৩৫ লাখ টাকা ভর্তি একটি কাঁধের ব্যাগ লুট করে।

গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, চাঁদা না দেওয়ার কারণেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন

এমন প্রকাশ্য হামলার পরও পুলিশ ও ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা গেছে। চকবজার থানার পরিদর্শক মোহাম্মদ নাজের হোসেন বলেন, হামলার আগে চাঁদা দাবির বিষয়টি ডিডিএন কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানায়নি। তিনি বলেন, ‘যদি আমরা আগে জানতাম, তবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারতাম।’

তবে প্রতিষ্ঠানের হেড অব সেলস মো. রবিউল হোসেন রকিব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় ঘটনার পরও তারা কোনো পুলিশি নিরাপত্তা পাননি। তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিসে দিনের আলোতে হামলা হলো, অথচ আমরা কোনো নিরাপত্তা পেলাম না। আমরা দায়ীদের দ্রুত বিচার চাই।’

এই পরিস্থিতি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আরও বেশি আশঙ্কায় ফেলেছে।

অভিযুক্ত সিন্ডিকেটের বিস্তার

ডিডিএন অফিসে এ হামলা বড় সাজ্জাদ নেটওয়ার্কের অপরাধের তালিকায় নতুন একটি ঘটনা মাত্র। তদন্তকারীরা জানান, এই সিন্ডিকেটের জাল এখন বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি এবং রাউজান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ১০ কোটি টাকা চাঁদা না দেওয়ায় স্মার্ট গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ও সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমানের বাড়িতে এই চক্রের সন্ত্রাসীরা দুইবার গুলি চালায়। একইভাবে খুলশীর এক ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ লাখ টাকা এবং চান্দগাঁওয়ের ‘জি ডট টেক সলিউশন’ থেকে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। গত আগস্টে হাটহাজারীর এক ব্যবসায়ীও তাদের গুলির শিকার হন।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই সিন্ডিকেটের কারণে পুরো এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা এখন চরম আতঙ্কে আছেন।

বিদেশ থেকে পরিচালিত অপরাধ চক্রের জাল

বড় সাজ্জাদের এই গ্যাংটি মূলত দুই স্তরে কাজ করে। শীর্ষ নেতারা বিদেশ থেকে পরিকল্পনা করে, আর স্থানীয় অপরাধীরা তা মাঠে বাস্তবায়ন করে। গত বছর গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত দেশীয় অংশের দায়িত্বে ছিল সাজ্জাদ হোসেন ওরফে “ছোট সাজ্জাদ”। সে জেলে যাওয়ার পর, প্রায় ৫০ জনের এই বাহিনীর নেতৃত্ব এখন মোবারক হোসেন ইমন, মোহাম্মদ রায়হান এবং বোরহান উদ্দিনের হাতে।

তদন্তে জানা গেছে, এরা দ্রুত হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল ব্যবহার করে। শহরে ঝটিকা অভিযান শেষেই তারা চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের প্রত্যন্ত আস্তানায় বা নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে পড়ে।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পুলিশ অনেক মামলা করেছে, বেশ কিছু চুনোপুঁটি অপরাধীকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারও করেছে। কিন্তু মূল হোতারা বিদেশে থাকায় তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য হতাশার বড় কারণ।