Image description

জামালপুরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা। গত মে ও জুন দুই মাসেই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর, নদী, ডোবা ও বিলে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে ২৫ জনের বেশি মানুষ, যার মধ্যে অন্তত ২০ জনই শিশু। সাঁতার না জানা, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং অরক্ষিত জলাশয়কে এসব মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে ২০২৫ সালে জেলায় ৩০ জনের বেশি শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুর পর চলতি বছরের এই পরিসংখ্যান নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

জেলা পুলিশের অপরাধ তদন্ত শাখা (সিআইডি) ও স্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জেলায় পানিতে ডুবে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৫ থেকে ৮৭ শতাংশই ১-৯ বছর বয়সি শিশুদের।

 

‘ওইদিন দুপুরে আমাকে বললো- আব্বু ২০ টাকা দাও, ডিম কিনে খাবো। আব্বুরে বিশ টাকা দিলাম। খুব খুশি হইলো। এরপর বাড়িতে এসে শুনি আমার বাবা মারা গেছে। এখন আমাদের কিছু বলার কোনো ভাষা নেই। ছেলের লাশ কাঁধে নিছি, এর চেয়ে ভারী কিছু পৃথিবীতে আর নেই।’

তথ্য বলছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে। এসময় মা-বাবা বা পরিবারের সদস্যরা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকায় শিশুরা সবার অগোচরে বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা, নালা কিংবা খালে পড়ে যায়। ফলে অল্প সময়ের অসাবধানতাই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় পরিণত হয়।

এছাড়া জেলা সদরের তুলনায় ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও মেলান্দহ উপজেলার গ্রাম ও চরাঞ্চলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কয়েক গুণ বেশি। এসব এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়ির কাছেই উন্মুক্ত জলাশয় রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, গ্রামাঞ্চলে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার শহরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এদিকে বর্ষা ও বন্যা মৌসুম, বিশেষ করে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে জেলায় ৮০ শতাংশের বেশি পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবিধৌত এ জেলায় টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদী-নালা ও খাল উপচে গ্রামাঞ্চল প্লাবিত হলে খেলাধুলা, গোসল কিংবা অসাবধানতাবশত পানিতে নেমে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যায়।

 

গত ৯ জুন দুপুরে জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মঞ্জু-বন্যা দম্পতির জীবনে নেমে আসে অপূরণীয় শোক। বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে প্রাণ হারায় তাদের আট বছরের ছেলে রিফাত। রিফাতের সঙ্গে তার এক বন্ধুও মারা যায়। সেই ঘটনার পর থেকে যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে পুরো বাড়ি। সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা বন্যা বেগম।

‘পানিতে ডুবে শিশু মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো খাল-বিল, নদী-নালা ও পুকুরগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া। প্রাকৃতিক জলাশয় কমে যাওয়ায় শিশুরা আগের মতো সাঁতার শেখার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতার পানিতেও ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।’

ছেলের শেষ স্মৃতি স্মরণ করে অশ্রুসিক্ত চোখে মঞ্জু মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘ওইদিন দুপুরে আমাকে বললো- আব্বু ২০ টাকা দাও, ডিম কিনে খাবো। আব্বুরে বিশ টাকা দিলাম। খুব খুশি হইলো। এরপর বাড়িতে এসে শুনি আমার বাবা মারা গেছে। এখন আমাদের কিছু বলার কোনো ভাষা নেই। ছেলের লাশ কাঁধে নিছি, এর চেয়ে ভারী কিছু পৃথিবীতে আর নেই।’

জামালপুরে বাড়ছে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু, নেপথ্যে কী?

শুধু রিফাত নয়, গত দুই মাসে জামালপুরের পুকুর, নদী, বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জনেরও বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে অন্তত ২০ জনই শিশু। স্থানীয়দের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক জলাশয় কমে যাওয়ায় শিশুদের সাঁতার শেখার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। এর সঙ্গে অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং অরক্ষিত পুকুরপাড় ও জলাশয় মিলিয়ে এসব স্থান যেন শিশুদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। নিহত শিশুদের স্বজন ও জেলার সচেতন নাগরিকরা এমন পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ছেলে হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন মেলান্দহ উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল রফিক। কথা বলতে গিয়ে বারবার কেঁপে ওঠে তার কণ্ঠ, ভিজে ওঠে চোখ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘পুকুরের কিনার দিয়ে যদি নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকতো, তাহলে ওরা পুকুরে যাইতো না। গেলেও এখানে বাধাগ্রস্ত হইতো। আমি দোষ দিবো পুকুর মালিকদের। সারা বাংলাদেশে যারা পুকুর খনন করছে তাদের দোষ দিবো। পুকুরের কিনারা দিয়ে নিরাপত্তা কেন দিলো না?’

ইসলামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচঅ্যান্ডএফপিও) ডা. এ. এ. এম. আবু তাহের জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এটি নদীবেষ্টিত ও বন্যাপ্রবণ এলাকা। বর্ষা মৌসুমে নদী, খাল-বিল, পুকুর ও বিভিন্ন জলাশয়ের পানি বেড়ে যাওয়ায় শুধু শিশুরাই নয়, অসাবধানতাবশত অনেক বৃদ্ধ ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও পানিতে ডুবে দুর্ঘটনার শিকার হন। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। তাই শিশুদের প্রতি অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের সাঁতার শেখানো, জলাশয়ের আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং সবাইকে সচেতন করতে পারলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।’

জামালপুরের মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শিশুদের জীবনেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

তার ভাষায়, ‘পানিতে ডুবে শিশু মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো খাল-বিল, নদী-নালা ও পুকুরগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া। প্রাকৃতিক জলাশয় কমে যাওয়ায় শিশুরা আগের মতো সাঁতার শেখার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতার পানিতেও ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।’

‘জামালপুর জেলার অধিকাংশ উপজেলায় নিজস্ব কোনো ডুবুরি দল (ডাইভিং টিম) নেই। কোথাও পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে জেলা সদর থেকে ডুবুরি দল পাঠাতে হয়। ফলে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লেগে যায়, যা উদ্ধার অভিযানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।’

শিশুদের নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) কর্মী মিনারা বলেন, ‘শিশু মৃত্যুর এই প্রবণতা রোধে অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব, শিশুদের সাঁতার শেখানোর উপযুক্ত জায়গা সংকট এবং তাদের সাঁতার শেখানোর বিষয়ে পরিবারের অনীহার কারণে অনেক শিশু সাঁতার শিখতে পারছে না। ফলে সামান্য পানিতেও তারা ঝুঁকির মুখে পড়ছে, এমনকি প্রাণও হারাচ্ছে।’

জামালপুরে বাড়ছে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু, নেপথ্যে কী?

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির জামালপুর জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা সুলতানা আহমেদ স্বপ্না জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিভিন্ন সভার মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন করা হচ্ছে। উপদেশ দেওয়া হচ্ছে কীভাবে চললে শিশুরা পানিতে ডুববে না। বাচ্চাদের সবসময় কাছে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে মাসে আমরা একটি করে সভা করি।’

সুলতানা আহমেদ স্বপ্না আরও বলেন, ‘অরক্ষিত পুকুরগুলোর পাড়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আর চলতি বছর জেলায় সরকারিভাবে শিশুদের সাঁতার শেখানোর প্রকল্প না থাকলেও ২০২৭ সালে এমন একটি কার্যক্রম চালু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’

জামালপুর জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি প্রতিরোধযোগ্য। শিশুদের কখনোই একা জলাশয়ের আশপাশে যেতে দেওয়া উচিত নয়। অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক নজরদারির পাশাপাশি শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং বাড়ির আশপাশের পুকুর, ডোবা ও অন্যান্য জলাশয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ ধরনের মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।’

জামালপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার রবিউল ইসলাম আকন্দ জাগো নিউজকে বলেন, ‘জামালপুর জেলার অধিকাংশ উপজেলায় নিজস্ব কোনো ডুবুরি দল (ডাইভিং টিম) নেই। কোথাও পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে জেলা সদর থেকে ডুবুরি দল পাঠাতে হয়। ফলে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লেগে যায়, যা উদ্ধার অভিযানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। নদীবেষ্টিত ও বন্যাপ্রবণ এ জেলায় ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল ও প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম থাকলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়াও অত্যন্ত জরুরি।’