দেশে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও সোমবার অনুষ্ঠিত হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এতে কোমর সমান পানিতে ভিজে, নৌকায় ও রিকশায় উঠে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় এবং রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় বিলম্বে কেন্দ্রে পৌছাতে দেখা গেছে অনেককে।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের আঙিনা ও আশপাশের সড়কে কোমরসমান পানি। অনেক পরীক্ষার্থী দীর্ঘ পথ হেঁটে কেন্দ্রের সামনে এসে নৌকায় চড়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করছেন। খবর পেয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্লাস্টিকের নৌকা ও ভ্যানের ব্যবস্থা করেন। জলাবদ্ধতার কারণে নিচতলার কক্ষগুলোতে পরীক্ষা না নিয়ে দোতলা ও ওপরের কক্ষগুলোতে অনুষ্ঠিত হয় পরীক্ষা।
আজ সোমবার দিনভর গণমাধ্যমে উঠে আসে বিভিন্ন জেলার কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্ভোগের চিত্র। পরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়।
বৈরি পরিস্থিতিতে পরীক্ষা কেন স্থগিত করা হয়নি এমন সমালোচনার পর শিক্ষাবোর্ডগুলো বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে পরীক্ষা স্থগিত হয় মাঠ প্রশাসনের প্রতিবেদনে আলোকে। সোমবারের পরীক্ষার ব্যাপারে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) পরীক্ষা নিতে কোনো বাধা নেই এমন গ্রিন সিগন্যাল এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসের পর সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে স্থানীয় দুর্যোগের কারণে শুধু চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা আগেই ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। কুমিল্লাসহ যেসব কেন্দ্রে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং দেরিতে আসা পরীক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দেওয়ার নির্দেশনা ছিল।
বন্যা পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন আগামীর সময়কে বললেন, ‘দুর্যোগকালীন সময়ে পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া হয় সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, আমরা সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সোমবারের পরীক্ষা নিয়ে রবিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তিন দফায় বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর সঙ্গে কথা বলেছি। আবহাওয়া অফিসের ব্রডকাস্টও নিয়েছি। কোনো ডিসি পরীক্ষা স্থগিত করার মতো পরিস্থিতির প্রতিবেদন দেননি। আবহাওয়া অধিদপ্তরও এমন কোনো পূর্বাভাস দেয়নি। তাহলে আমি কীভাবে পরীক্ষা স্থগিত করব? সব ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারদের কাছ থেকে পাওয়া অনুকূল প্রতিবেদনের আলোকেই পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। চট্টগ্রামের স্থানীয় প্রশাসনের সুপারিশই ওই বোর্ডের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।’
কুমিল্লার ঘটনার প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘সেখানে সর্বোচ্চ সহানুভূতি দেখানো হয়েছে। একজন ছাত্রী পানিতে পড়ে ভিজে যাওয়ার পর বাসা থেকে শুকনো কাপড় এনে তাকে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব কেন্দ্রকে আগে থেকেই বলা ছিল বৈরি আবহাওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থী দেরিতে এলে তাকে অতিরিক্ত সময় দিয়ে পরীক্ষা নিতে হবে। যেখানে এমন পরিস্থিতি হয়েছে, সেখানে সেটিই করা হয়েছে।’
‘কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষা কেন্দ্র বা আশপাশের এলাকা জলমগ্ন হলে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিকল্প স্থানে পরীক্ষা নেওয়া বা পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছানোর বিশেষ ব্যবস্থা করার সুযোগ রয়েছে। তবে এবার দেশের কোথাও যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। কুমিল্লাসহ যেসব স্থানে সমস্যা হয়েছে সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে’, যোগ করেন তিনি।
বর্ষাকালে পরীক্ষা আয়োজন দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা জানিয়ে এহছানুল হক মিলন জানালেন, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা বছরের শুরুতে আনার জন্য কাজ চলমান। ইতিমধ্যে ২০২৭ সালের এসএসসি ৭ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি এবং এইচএসসি ৬ জুন থেকে ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে শেষ করার সম্ভব্য রুটিন ঘোষণা হয়েছে।
মন্ত্রীর ভাষ্য, ঢাকাসহ সারা দেশের বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি মন্ত্রণালয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বন্যা বা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বোর্ড এককভাবে পরীক্ষা স্থগিত করতে পারে না বলে জানালেন শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিবেদন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্প্রতি একই প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সারা দেশে মাদ্রাসা বোর্ডের পরীক্ষা একযোগে অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। কিন্তু অন্য কোনো জেলা থেকে পরীক্ষা স্থগিতের মতো প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।’
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু বললেন, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত মাঠ প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়। আমাদের অধীন ১৩ জেলার ডিসিরা পরীক্ষা নেওয়ার অনুকূল পরিবেশের কথা জানানোর পরই আমরা পরীক্ষা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চাই। কোনো কেন্দ্র জলাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হলে উপজেলা প্রশাসন ডিসির মাধ্যমে জানালে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেত। পরীক্ষার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আমরা সার্বক্ষণিক সতর্ক আছি এবং আবহাওয়া অফিস ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।
এদিকে সোমবার সকালে টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের আঙিনা ও আশপাশের সড়ক হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক পরীক্ষার্থী দীর্ঘ পথ হেঁটে কেন্দ্রের সামনে এসে নৌকায় চড়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেন। খবর পেয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্লাস্টিকের নৌকা ও ভ্যানের ব্যবস্থা করেন। জলাবদ্ধতার কারণে নিচতলার কক্ষগুলোতে পরীক্ষা না নিয়ে দোতলা ও ওপরের কক্ষগুলোতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।